কৃষি ডেস্ক ::
বাংলাদেশে রবি মৌসুম এখন তরমুজ চাষের জন্য এক সম্ভাবনাময় ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া, পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং রোগবালাই কম থাকার কারণে এই মৌসুমে তরমুজের বৃদ্ধি দ্রুত হয়, ফলের আকার বড় হয় এবং উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম পড়ে। দক্ষিণাঞ্চল, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় রবি মৌসুমের হাইব্রিড তরমুজ স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সারা দেশে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে।
এই চাষাবাদ শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধি নয়; বরং স্থানীয় শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান, পরিবহন খাতের সক্রিয়তা, পাইকারি ও খুচরা বাজারে নতুন সম্ভাবনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থায়ী অবদান রাখছে। সঠিক জমি নির্বাচন, পরিকল্পিত সার ব্যবস্থাপনা, উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক সেচব্যবস্থা ব্যবহার করলে রবি মৌসুমে তরমুজ চাষ কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।
🔳উপযুক্ত জমি নির্বাচন:
বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি উত্তম।
পানি যেন না জমে—এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত রোদ পাওয়া যায় এমন জমি নির্বাচন করুন।
আগাছা ও খড়কুটোমুক্ত জমি তরমুজের দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়ক।
🔳 বপন/রোপণের সময়:
আদর্শ সময়: নভেম্বর–ডিসেম্বর।
শুরুর ডিসেম্বরের মধ্যেই চারা স্থাপন করলে ফলন বেশি হয়।
🔳 জমি প্রস্তুতি:
প্রতি বিঘায় ২০–২৫ কেজি ভালো মানের পচা গোবর/কম্পোস্ট।
গর্ত পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর:
গর্ত ১–১.৫ ফুট গভীর ও ৩–৪ ফুট দূরত্বে।
গর্তের মাটিতে সার মিশিয়ে ৫–৭ দিন আগে প্রস্তুত করলে মাটির উর্বরতা বাড়ে।
🔳 রবি মৌসুমে লাভজনক তরমুজের জাতসমূহ:
(ফলন, বাজারদর, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও চাহিদার ভিত্তিতে)
★হাইব্রিড তরমুজ (সর্বাধিক লাভজনক)
১) Black Beauty F1 (ব্ল্যাক বিউটি)
অতিমিষ্ট (ব্রিক্স ১২–১৪)
ছত্রাক রোগ সহনীয়
রবি মৌসুমের জন্য খুব জনপ্রিয়
বাজারে চাহিদা বেশি
২) Black Dragon F1
অভিনব কালো খোসা
ওজন ৩–৫ কেজি
আগাম ফল দেয়, তাই লাভ বেশি
৩) BK 555 / BK Gold 555
রবি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়
ফলন বেশি, বাজারদর ভালো পায়
৪) Sweet Wonder F1
শাঁস লাল, মিষ্টি, পরিবহণ সহনীয়
পাইকারি বাজারে মূল্য স্থিতিশীল
৫) Fairy F1 / Red Queen F1
মাঝারি আকারের, মজবুত খোসা
দূরপাল্লায় পরিবহণে কম নষ্ট হয়
বাণিজ্যিক চাষের জন্য সেরা
৬) Yellow Dragon F1 (হলুদ শাঁস)
রবি মৌসুমে বিশেষ চাহিদা থাকে
উচ্চ দামের কারণে বেশি লাভজনক
৭) Seedless Hybrid সিরিজ
শহরাঞ্চলে দাম বেশি
কম প্রতিযোগিতা, ফলে লাভ বেশি
🔳 উন্নত/বারি জাত (বিশ্বস্ত ফলন, কম খরচ):
১) বারি তরমুজ-৩
মাঝারি আকার
ছত্রাক রোগ কম হয়
রবি মৌসুমে ফলন স্থিতিশীল
২) বারি তরমুজ-৪
খরার সহনশীল
ফলন বেশি, কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয়
৩) বারি তরমুজ-৫
আগাম জাত; রবি মৌসুমে দ্রুত বাজারজাত করা যায়
মিষ্টতা ভালো
৪) Crimson Sweet (উন্নত বিদেশি জাত)
বাজারে চাহিদাসম্পন্ন
পরিবহণ সহনশীল
৫) Sugar Baby
ছোট আকার, আগাম ফসল
রবি মৌসুমে দামের পার্থক্য বেশি পাওয়া যায়
🔳 রবি মৌসুমে সবচেয়ে হাই লাভ দেয় যেসব জাত:
👉 Black Beauty F1
👉 BK 555 / BK Gold 555
👉 Black Dragon F1
👉 Sweet Wonder F1
👉 Yellow Dragon F1
👉 বারি তরমুজ-৩
🔳 সঠিক সার প্রয়োগ:
১. প্রাথমিক সার (বেসাল ডোজ) — প্রতি বিঘায়
ইউরিয়া: ২০–২৫ কেজি
টিএসপি: ১২–১৫ কেজি
এমওপি: ১৫–২০ কেজি
জিপসাম: ৫ কেজি
দস্তা: ১ কেজি (মাটিতে দস্তার ঘাটতি থাকলে)
২. টপ ড্রেসিং (গাছ বড় হওয়ার পর)
৩০–৩৫ দিনে:
ইউরিয়া: ৮–১০ কেজি
এমওপি: ৮–১০ কেজি
🔳ফল ধরার সময়:
ইউরিয়া: ৫–৭ কেজি (পাতলা করে সেচ লাইনে)
নোট: অতিরিক্ত নাইট্রোজেন দিলে লতা বেশি বাড়ে, ফল ছোট হয়।
🔳 মালচিং ব্যবহার:
কালো প্লাস্টিক মালচিং বা খড় বিছিয়ে দিলে—
আগাছা কমে
মাটির আর্দ্রতা থাকে
ফল মাটির সংস্পর্শে নষ্ট হয় না
🔳 সেচ ব্যবস্থাপনা:
ড্রিপ/ফিতা সেচ ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে কার্যকর।
বীজ অঙ্কুরোদ্গম, শাখা বৃদ্ধির সময় এবং ফল বড় হওয়ার সময় যথাযথ সেচ দেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত পানি শিকড় পচা ও ফল ফাটার কারণ হতে পারে।
🔳 পরাগায়ন উন্নয়ন:
সকালে মৌমাছির চলাচল বাড়াতে আশেপাশে ফুলগাছ রাখুন।
প্রাকৃতিক পরাগায়ন কম হলে হাতে পরাগায়ন করা যেতে পারে।
🔳 লতা ও ফল ব্যবস্থাপনা:
অতিরিক্ত লতা ছাঁটাই করুন।
প্রতি গাছে ২–৩টি স্বাস্থ্যবান ফল রাখলে ফল বড় ও সুগঠিত হয়।
নিয়মিত ফল উল্টে দিলে একদিকে দাগ পড়ে না।
🔳 রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন:
সাধারণ রোগ: ডাউনি মিলডিউ, পাউডারি মিলডিউ, ফল পচা।
প্রতিরোধ:
অনুমোদিত ছত্রাকনাশক
আলো ফাঁদ, বিটল ট্র্যাপ
নিয়মিত লতা পর্যবেক্ষণ
বাগানে বাতাস চলাচল বাড়াতে গাছের ঘনত্ব কম রাখুন।
🔳তরমুজ চাষের উপকারিতা:
স্বল্প সময়ে বেশি লাভ: ৬৫–৮০ দিনে ফসল সংগ্রহ করা যায়।
চাষের খরচ কম: সার, সেচ ও পরিচর্যা কম লাগে।
লবণাক্ত জমিতে উপযোগী: দক্ষিণাঞ্চলে খুব ভালো ফলন দেয়।
বাজারে উচ্চ চাহিদা: রবি মৌসুমে লাভ বেশি পাওয়া যায়।
জমির সঠিক ব্যবহার: পতিত জমি কাজে লাগে, বছরে দু’বার ফলন পাওয়া সম্ভব।
শ্রম কম লাগে: ব্যবস্থাপনা সহজ।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ: পরিবারে পুষ্টি যোগায়।
🔳ফল সংগ্রহ:
বপনের ৬৫–৭৫ দিনের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়।
ডাঁটার পাশে শুকনো ভাব, চকচকে খোসা এবং টোকা দিলে গভীর শব্দ—এটাই পাকভাবের লক্ষণ।
চরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে রবি মৌসুমের হাইব্রিড তরমুজ অত্যন্ত লাভজনক।
মাটির ঢিবি করে চাষ করলে পানি জমে না এবং শিকড় সুরক্ষিত থাকে।
বাগান নিয়মিত মনিটরিং করলে রোগবালাই দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
লেখক:
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
★ সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।