মুক্তা রাণী সাহা। বয়স প্রায় একুশের কোঠায়। বিয়ে হয় বছর সাতেক আগে চৌদ্দ বছরের কিশোরী বয়সে, পয়ত্রিশোর্ধ এক মালয়েশিয়া প্রবাসীর সাথে। সাত বছরের এই দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে গড়পড়তা বছরখানেক স্বামীর সাথে ঘর সংসার করেন মুক্তা। অবশিষ্ট বছরগুলো মালয়েশিয়ার মাটিতেই কাটান স্বামী তপন সাহা। তার বয়স এখন প্রায় বিয়াল্লিশ। দেব সাহা নামে তাদের তিন বছরের একটি পুত্র সন্তানও রয়েছে মুক্তার কোল জুড়ে।
মুক্তা তার শিশু সন্তান দেবকে নিয়ে শশুর, শাশুড়ীর তত্বাবধানেই বসবাস করছেন শশুরের রূপসদীর বাড়িতে। কিন্তু শশুর-শাশুড়ী আর প্রৌঢ় স্বামীর অসহনীয় অত্যাচারে অতিষ্ট হয়েও এই পরিবারের বিচিত্র পরিবেশে সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তায় নানা তিক্ততার মধ্যে দিন পার করছেন আর দশটি সাধারন গৃহিনীর মতো স্বামী সোহাগ বঞ্চিত এই গৃহবধু। বাবা মায়ের সংসারে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর এলাকাবাসীর কটুক্তির ভয়ে অত্যাচারের ওই সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িতে কিংবা স্বজনদের কাছেও আশ্রয় নিতে সাহস পাচ্ছেন না নির্যাতিত গৃহবধূ মুক্তা সাহা।
অভিযোগের সূত্র ধরে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী গ্রামের বাসিন্দা হারাধন সাহার মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে তপন সাহার সাথে পার্শবর্তী নবীনগর উপজেলার ভোলাচং গ্রামের যদু সাহা-মনিসাহা দম্পত্তির মেয়ে মুক্তা সাহার সামাজিক রীতি ও সনাতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় সাত বছর আগে ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে হয়। তখন মুক্তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ এর কোঠায়। সবেমাত্র অষ্টম শ্রেনীতে উঠেছেন। মুক্তো ঝরানো অসাধারণ হাসি আর আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী হওয়ায় মুক্তা রাণীর ওপর লালসার নজর পড়ে তপন সাহার।
তপন সাহা নানা কৌশলে বিভিন্ন মহলকে ব্যবহার করে মুক্তার অভিভাবকদের প্ররোচনার মাধ্যমে রাজী করান, অপ্রাপ্ত বয়স্ক অপরূপা কিশোরী মু্ক্তা রানীকে তার চেয়েও বয়সে ২১ বছরের বড়ো ভিলেন চরিত্রের পাত্র তপন সাহার সাথে বিয়ে দিতে।
অসম এ বিয়েতে তখন বেঁকে বসেন কিশোরী মুক্তা। আর এ কারণেই সৎ কাকা অপু সাহা মারতে পর্যন্ত গিয়েছিলেন মুক্তাকে। মুক্তা ছিলেন লেখাপড়া করে নিজ পায়ে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর। সহজ সরল বাবা মা তাদের প্রথম সন্তান তমা রানী’র বাল্য বিয়েতে সংসারের অশান্তি দেখে দ্বিতীয় সন্তান কিশোরী এই মেয়ের স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছিলেন। কিন্তু প্রবাসী পাত্রের অর্থের লোভের বশবর্তী হয়ে হার মানেন স্বজনসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। অবশেষে পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্ত আর মানসিক চাপের কাছে হার মানেন কিশোরী মেয়ে মুক্তা।
মুক্তার বাবা যদু সাহা তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে জমি বিক্রি করে চার ভরি স্বর্নলংকার আর নগদ এক লক্ষ টাকা যৌতুক দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। বিয়ের কিছুদিন পর মুক্তার স্বামী আবার মালয়েশিয়া চলে যান। ফের ২০১৭ সালে জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে দেশে চলে আসেন। এ যাত্রায় চার মাস পর আবার মালয়েশিয়া চলে যান।
ইতোমধ্যে সন্তান সম্ভবা স্ত্রীর ডেলিভারির সম্ভাব্য তারিখ সামনে রেখে ওই বছরের অক্টোবরে আবার দেশে ফেরেন। ১৯ অক্টোবর মুক্তা সিজারের মাধ্যমে ছেলে দেব সাহার জন্ম দেন। ছেলের জন্মের দু’ মাসের মাথায় আবার মুক্তার স্বামী তপন সাহা মালয়েশিয়া চলে যান। এরপর আর তিনি দেশে ফেরেননি। এদিকে, গৃহবধু মুক্তার ওপর চলছে শশুর-শাশুড়ির অসহনীয় চাঁপা মানসিক অত্যাচার ছাপিয়ে শারীরিক নির্যাতনও। সত্তরোর্ধ বয়সী শশুর হারাধন সাহা বেশীরভাগ সময়ে শুয়ে বসে কাটালেও তাকে কোন রকম সহযোগিতা বা সঙ্গ দিচ্ছেন না স্ত্রী রিনা সাহা(৬০)। সূ্ত্র জানায়, দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তাদের দু’জনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক বা কথাবার্তা নেই।


একই ঘরে বসবাস করলেও সাপে-নেউলের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তাদের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে। তাই বৃদ্ধ এই শশুরের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব এসে পড়েছে পুত্রবধূ মুক্তা রাণীর ওপর। মুক্তা বলেন, সংসারের সব কাজ সামলে একটু আধটু বিশ্রাম নিলেও তাতে যেন তাদের স্বস্তি নেই, আমার এতটুকুন ছেলের দুষ্টুমিতেও যেন সব সময় আমার দোষ খুঁজে পায় তারা। কারো সাথে কথা বলা বা সখ্যতা করা যেন কল্পণারাজ্য! মনে হয় যেন আমি খাঁচাবন্দি কোনো একটি বণ্য প্রাণী। এতেও আমার কোনো ক্ষোভ বা কষ্ট নেই। কষ্টটা তখনই লাগে যখন কারণে-অকারণে আমার শশুর আমার বাবা-মা তুলে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দেয়। শাশুড়ী হা করে শুনলেও কোনো প্রতিবাদ করেন না। শশুরের অত্যাচার বাড়ার কারণে শাশুড়ী এখন কিছুটা মৌনতা দেখালেও এক সময়ে তার আচরনও ছিল খুবই হিংস্র।

আমাকে গালিগালাজ করে সেটা আমি শত কষ্ট হলেও সহ্য করতে পারি, কিন্তু আমার জন্মদাতা নির্দোষী সহজ সরল বাবা মাকে তুলে যাচ্চেতাই ভাষা প্রয়োগ করবে সেটা সহ্য সীমার বাইরে চলে যায়। স্বামীকে এসব বিষয়ে জানালে মোবাইলে হুমকি দিয়ে আরো আজবাজে ভাষায় গালিগালাজ করে স্বামী তপন সাহা ছেলেকে রেখে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলেন; নচেৎ দেশে এলে পেটাতে পেটাতে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেবেন। এসব কারণে, বেশ ক’বার আত্মহত্যার ভূত মাথায় চেপেছিল; কিন্তু ছেলেটা এতিম হয়ে যাবে এ কথা ভেবে তা আর পারিনি। তাদের অত্যাচারের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলে একবার এ সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম। সে যাত্রায় আমার শশুর বাড়ির লোকজন স্থানীয় মাতব্বরদের নিয়ে আমার বাবার বাড়িতে এসে স্বর্নালঙ্কার চুরি করে পালানোর অপবাদ দিয়ে বাবা মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কতগুলো কাগজপত্র আর ব্লাঙ্ক স্ট্যাম্পে আমার বাবার সই-স্বাক্ষর করিয়ে আমাকে নিয়ে যায়। তখন তারা হুমকি দিয়ে বাবা মাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আপনাদের মেয়ে যাতে আর এভাবে আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে না আসে এবং আত্মহত্যা করলেও যেন আমাদের ওপর কোনো দোষ চাপাতে না পারেন এজন্যে কাগজপত্রে আগাম স্বাক্ষর নিয়ে নিলাম। মুুক্তা অসহায়ের সুরে আরো বলেন, আমার বাবা-মা গরীব বলে সবাই মিলে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে, আর আমি পেটের দায়ে চারটে ভাতের জন্য এ বাড়ির গৃহবধূর বদলে একজন গৃহপরিচারিকার মতো তা নীরবে মুখ বুুুঝে সহ্য করে যাচ্ছি। কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে আমি নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে স্বনির্ভর হতে পারতাম। তাহলে অন্তত: পরনির্ভরশীলতার গ্লানি নিয়ে অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াতে হতো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে মুক্তার মা মনি সাহা বিভিন্ন কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেস্টা করলেও অপরিণত বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার আইনগত জটিলতা নিয়ে এ প্রতিনিধির চ্যালেঞ্জ ও জেরার মুখে এক পর্যায়ে মুক্তার শশুর পক্ষের লোকজনের স্বাক্ষর নেয়ার ঘটনার কথা স্বীকার করে কষ্টের নি:শ্বাস টেনে বলেন, আমাদের অভাবের সংসারে নানা টানাপোড়েনের কারণে স্বজনদের প্ররোচনায় তখন আমাদের নাবালক মেয়েকে বেশি বয়সী ছেলের সাথে বিয়ে দেই।

তখন আত্মীয় স্বজন সবাই বলেছিল, ছেলে বিদেশ থাকে অর্থ সম্পদের অভাব নেই; ছেলের বয়স বেশি হলেও এখানে মেয়ের বিয়ে দিলে ও খুব শান্তিতেই থাকবে। সকলের কথায় অন্ধবিশ্বাসে তখন মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এ বিয়েতে রাজী হয়েছিলাম। মেয়ের সুখের কথা ভেবে বাড়ির জায়গাজমি বিক্রি করে তখন নগদ ১ লক্ষ টাকা যৌতুক ও ৪ ভরি স্বর্নের জিনিস দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেই। বিয়ের পরে জানতে পারি, জামাই সোনা-দানা বেঁচে ও ধার-দেনা করে বিদেশ গেছে। কিন্তু আজ অব্দি কারো দেনা পরিশোধ করেনি। আমার মেয়ে তার ননদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে বিয়েতে দেয়া জিনিস শশুরের হাতে তুলে দিলে শশুর তা বিক্রি করে তার মেয়ের পাওনা টাকা পরিশোধ করে দেন। এ নিয়েও আমার মেয়ের ওপর অকথ্য নির্যাতন শুরু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিচিত্র ওই পরিবারটির মধ্যে সুখ-শান্তির কোন ছোঁয়া নেই। মুক্তার শশুর হারাধন সাহা ও শাশুড়ী রিনা সাহার মধ্যে যেমন দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছরের দাম্পত্য কলহ বিরাজ করছে, তেমনি তাদের সাথে নেই নিজ সন্তানদের মধুর কোনো সম্পর্ক। তাদের ছোট্ট সন্তান পপি সাহাও শশুর বাড়িতে ছিলেন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। বাবার বাড়িতে আশ্রয় চেয়েও না পেয়ে স্বামী সুবল সাহা ও শশুর-শাশুড়ীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নির্যাতনের শিকার হয়ে কুমিল্লার বেগনাবাজ গ্রামে শশুর বাড়িতেই বছর তিনেক আগে প্রাণ বিসর্জন দেন পপি সাহা। কিন্তু পপির শশুর বাড়ির লোকজন আত্মহত্যা বলেই চালিয়ে দেন লোমহর্ষক সেই হত্যাকান্ডের ঘটনাটিকে।
অপরদিকে, হারাধন-রিনা দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে ৩ ছেলে স্বপন, তপন ও মাখন থাকেন মালয়েশিয়ায়। বড় ছেলে স্বপন স্ত্রী সন্তানদের নিয়েই সেখানে বসবাস করেন। তিন মেয়ে যমুনা, অঞ্জনা আর মঞ্জু নিজ নিজ স্বামী সংসার নিয়ে থাকলেও খুব একটা শান্তিতে নেই বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়। সূত্রটি আরো জানায়, তাদের বড় ছেলে স্বপনের স্ত্রীর সাথে হৃদ্যতাপূর্ন আত্মিক সম্পর্কের কারণে তপন বাংলাদেশ আসতে তেমন একটা আগ্রহী নন। এ কারণে স্ত্রী-সন্তানের প্রতিও আকর্ষণ তেমনটি নেই। প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার মতো বাংলাদেশী টাকায় বেতন পেলেও তার পিতা-মাতা ও স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণের জন্য প্রতিমাসে পাঠান মাত্র দশ থেকে পনের হাজার টাকা। বেতনের বেশীর ভাগ টাকাই তপন সেই দেশে তার ভাইয়ের স্ত্রীর কল্যাণে ব্যয় করেন। অপরদিকে, সংসার খরচ বাবদ পাঠানো টাকার হিসেবও কড়ায় গন্ডায় স্ত্রীর কাছ থেকে চুকে নেন বলে ওই সূত্রটির দাবী। সূত্রমতে, তপন বিয়ের আগে নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বিয়ের পরেও সেই সম্পর্ক অটুট থাকায় স্ত্রী মুক্তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তা সংসার খরচের টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করলেও তার স্বামীর ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে কৌশলে এড়িয়ে যান।
এদিকে, মালয়েশিয়া যাওয়ার সময়ে তপন তার বোন অঞ্জনা রাণীর স্বামীর কাছ থেকে ধার-কর্জ নেয়া একটা বড় অংকের টাকা মুক্তা বিয়ের সময়ে বাবার দেয়া স্বর্নালঙ্কার বিক্রি করে পরিশোধ করেছেন। মুক্তা জানান, তার স্বামী তপন ৩ মাসের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলে ভগ্নীপতির কাছ থেকে টাকা ধার নেন। এতো বছরেও ওই টাকা পরিশোধ না করায় আত্মীয়তার সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করেছিল। এ নিয়ে ননদ অঞ্জনা সাহার ওপর স্বামীর মানসিক চাপ ও অত্যাচারও চলছিল। অঞ্জনা তার ভাইয়ের বউ মুক্তার অনুরোধে ভাই তপন সাহাকে টাকা ধার দিয়েছিল বলে মুক্তাকে দায়ি করে আত্মহত্যার হুমকিও দেয় অঞ্জনা। তা ঠেকাতেই বিয়ের সময় বাবার বাড়ি থেকে দেয়া স্বর্নের জিনিসগুলো শশুরের হাতে তুলে দিয়েছেন মুক্তা। শশুর হারাধন সাহা পুত্রবধুর দেয়া ওই স্বর্নালঙ্কারগুলো নিয়ে তা বিক্রি করে মেয়ে অঞ্জনার চট্টগ্রামের বাসায় ছেলের ধারকর্জ করা টাকা পরিশোধ করে দিয়ে আসেন। তা নিয়েও চলে মুক্তার ওপর তার স্বামীর নানারকম হুমকি ও পাশবিক নির্যাতন। স্বামী দেশে ফিরলে জীবনাশঙ্কার কথাও ব্যক্ত করেন মুক্তা।
অপরদিকে, এলাকার অন্যান্য পাওনাদারেরাও সুদ ও আসল টাকা পরিশোধের জন্য বাড়িতে এসে ঝামেলা করে ও মুক্তার ওপর চাপ দেয়। তার ওপর পরিবারের সদস্যের উপর্যুপরি মানসিক নির্যাতন চলছে এ কারণে আইনের আশ্রয় নেয়ার কথা বললে চার দেয়ালে বন্দি ওই নির্যাতিতা বলেন, আমাকে খাঁচায় বন্দি বন্যজন্তুর মতে সব সময়ে নজরবন্দি করে রাখেন আমার শশুর-শাশুড়ী আর তাদের আশির্বাদপুষ্টরা। বাড়ির চারপাশে হাটাচলার ওপরও থাকে তাদের সন্দেহপ্রবন নজরদারি। থানায় একটি জিডি করার কথা ভাবলেও বাড়ি থেকে বেরোনোর কোনো সুযোগ নেই। এ জটিল পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এসব ঘটনার বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে মুক্তার শশুর হারাধন সাহা উত্তেজিত স্বরে বলেন, আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে আপনি নাক গলাচ্ছেন কেন? আমি কথা কথা বলতে বাধ্য নই বলেই ফোনটি কেটে দেন।
পর্যবেক্ষক ও পাঠকদের উদ্দেশ্যে রূপসী দে’র ঘটনায় অনুসন্ধান টিভিনিউজ এ গত ১৩ নভেম্বরে প্রকাশিত সংবাদটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
যৌতুকের বলি কক্সবাজারের রুপসী দে : বিয়ের চার মাসের মাথায় স্বজনদের হাতে খুন
বাঞ্ছারামপুর থেকে
- আপডেট সময় : Friday, November 13, 2020
- 46 বার দেখা হয়েছে

মুক্তা সাহা:
রূপসী রাণী দে নামে এক গৃহবধূ পাষন্ড স্বামী, শশুর, শাশুড়ী ও ননদের পাশবিক নির্যাতনে অবশেষে জীবন দিয়েছেন। বিয়ের চার মাসের মাথায়ই ১৮ বছরের টগবগে যুবতী এই গৃহবধূ তার সোনালী স্বপ্নের জাল বিন্যাস্তের শুরুতেই যৌতুক নামের রাক্ষুসে থাবায় পরিবারের সদস্যের অমানুষিক অত্যাচারের বলি হন।
রুপসী রানী দে কক্সবাজার সদর থানার বিজিবি ঘৃত পল্লীর বাসিন্দা কালি শংকর দে এবং সবিতা বালা দে’র মেয়ে। গত ৩০ জুন রূপসীর সাথে একই থানার খরুশকুল ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের পূর্ব হিন্দু পাড়া নিবাসী ভরত চন্দ্র দে এবং ঝর্নাবালা দে’র ছেলে সজিব কান্তি দে’র সনাতন ধর্মীয় রীতি ণীতি অনুযায়ী সামাজিকভাবে বিয়ে হয়।
কিন্তু ঘুনাক্ষরেও কনেপক্ষ জানতে পারেনি যে, পাত্র সজিব ছিল মাদকাসক্ত। বিয়ের পর সজিবের আসল চরিত্র রূপসীর কাছে ধরা পড়ে। মাদকাসক্ত অবস্থায় প্রায়ই সজিব রূপসীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে অকথ্য নির্যাতন করত। রূপসী তার সোনালী স্বপ্ন আখড়ে ধরে সংসারটিকে টিকিয়ে রাখতে নীরবে নির্যাতন সহ্য করে আসছিল। মাদকাসক্ত স্বামী সজিব প্রায়ই নেশা করে এসে মাদকাসক্ত অবস্থায় স্ত্রীকে মারধর করে যৌতুকের জন্য চাপ দিত। কিন্তু রূপসীর পক্ষে তার গরীব পিতার নিকট থেকে সে আবদার মেটানো সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে সজিব, তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, দুই বোন ও তাদের স্বামী আর শাশুড়ি মিলে গত ০৯ নভেম্বর (সোমবার) রূপসীকে প্রচন্ড মারধর করতে থাকে। অমানুষিক নিযার্তন সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে রূপসী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে, অত্যাচারীরা মিলে নাটক সাজিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রূপসীর বাবার বাড়িতে খবর দিয়ে বলে, আপনাদের মেয়ে আত্মাহত্যা করেছে। এ খবর পেয়ে রূপসীর বাবার বাড়ির লোকজন আসতে আসতে তার শশুর বাড়ির লোকজন সবাই পালিয়ে যায়। রূপসীর বাবার বাড়ির লোকজন ঘরে এসে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় বাশেঁর আড়ার সাথে প্লাস্টিকের রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় দেখতে পান। পরে উপস্থিত পার্শ্ববর্তী লোকজনের সহায়তায় তাকে বাচাঁনোর জন্য তাড়াতাড়ি করে রশি কেটে নিচে নামানো হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশে সংবাদ দেয়া হলে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ গিয়ে নারী পুলিশ ও লোকজনের সহায়তায় লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়ে দেয়। রূপসীর পরিবার গরীব হওয়ায় কারো কাছ থেকে সাহায্য ও আইনের সহায়তা পাচ্ছেন না। হতভাগ্য এ পরিবারটি প্রধানমন্ত্রীসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ ও মানবাধিকার সংস্থার সহযোগিতা কামনা করছেন।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন