কৃষি ডেস্ক ::
রবি মৌসুমে সরিষা চাষের পাশাপাশি মৌচাষ করলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন বাড়ে, ফলে সরিষার শুঁটি বেশি ধরে এবং বীজ মোটা হয়। পাশাপাশি কৃষক পান বিশুদ্ধ সরিষা মধু, যা বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়।
⃣ সরিষার জমিতে মৌচাষ কেন লাভজনক?
সরিষা পরাগায়ন নির্ভর ফসল। মৌমাছি পরাগায়ন করলে শুঁটির সংখ্যা বাড়ে প্রতি শুঁটিতে বীজের সংখ্যা বাড়ে। ফলন ১৫-৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সরিষার ফুলে মধুরসের পরিমাণ বেশি। সরিষা মধু হালকা হলুদ, সুগন্ধি ও দ্রুত জমাট বাঁধে যা বিশুদ্ধতার লক্ষণ।
⃣ মৌচাক বসানোর সঠিক সময় :
বপনের ৩০-৩৫ দিন পর, যখন জমিতে
১০-১৫% ফুল ফুটতে শুরু করে
সাধারণ সময়:
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি।
ফুল ফোটার আগেই মৌচাক বসালে মৌমাছি খাবারের অভাবে দুর্বল হয়ে যায়
⃣ প্রতি বিঘায় কতটি মৌচাক বসাবেন?
জমির পরিমাণ মৌচাক সংখ্যা:
১ বিঘা ২–৩ টি
১ একর ৬–৮ টি
অতিরিক্ত মৌচাক বসালে ফুলের তুলনায় খাবার কম হয়ে মধু উৎপাদন কমে যায়।
⃣ মৌচাক স্থাপনের নিয়ম :
জমির আইল বা উঁচু শুকনা স্থানে বসাতে হবে
মৌচাক মাটি থেকে ১-১.৫ ফুট উঁচুতে রাখতে হবে।
চাকার মুখ পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রাখা ভালো।
বৃষ্টি ও কুঁয়াশা থেকে রক্ষায় উপরে টিন/পলিথিন ছাউনি দিতে হবে।
সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টার সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলতে হবে।
⃣ কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা :
ফুলের সময় কীটনাশক স্প্রে করা যাবে না
প্রয়োজনে-
সন্ধ্যার পর স্প্রে
মৌমাছি কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন বালাইনাশক
স্প্রে করার আগে মৌচাষিকে জানানো আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে, কীটনাশক ব্যবহারে মৌমাছি মারা গেলে ফলন ও মধু দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
⃣ মৌচাকের যত্ন ও ব্যবস্থাপনা:
মৌচাকের পাশে পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পিঁপড়া ঠেকাতে পায়া-গুলোর চারপাশে পানি/তেলযুক্ত পাত্র বসাতে হবে।
দুর্বল চাক হলে পাশের শক্ত চাক থেকে ব্রুড (ডিমসহ ফ্রেম) দেওয়া যায়।
সপ্তাহে অন্তত: ১ বার চাকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ।
⃣ বিশুদ্ধ সরিষা মধু সংগ্রহের সঠিক সময় ও পদ্ধতি:
মধু সংগ্রহের সময়:
ফুল ঝরার ৭-১০ দিন পর
যখন ফ্রেমের ৭৫-৮০% সিল (ঢাকনা) হয়ে যাবে।
সংগ্রহ পদ্ধতি:
ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে ফ্রেম বের করা
পরিষ্কার হানি এক্সট্রাক্টর ব্যবহার।
কোনোভাবেই- চিনি বা পানি গরম করা যাবে না।
⃣ সম্ভাব্য উৎপাদন ও আয় (গড় হিসাব):
প্রতি মৌচাক থেকে: ৮-১২ কেজি মধু।
বাজারদর (স্থানভেদে): ৫০০-৮০০ টাকা/কেজি
১ বিঘা জমিতে মধু থেকে আয়: ৮,০০০-১৫,০০০ টাকা।
সাথে সরিষার ফলন বাড়তি পাওয়া যায়।
⃣ কৃষকের জন্য বাস্তব পরামর্শ:
✔️ নিজের জমিতে মৌচাষি রাখতে পারেন (ভাড়াভিত্তিক)।
✔️ মৌচাষির সাথে আগে থেকে চুক্তি করা ভালো।
✔️ ব্লক আকারে সরিষা চাষ করলে মধু উৎপাদন বেশি হয়।
✔️ কৃষি অফিস/প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে মৌচাষ প্রশিক্ষণ নিলে ঝুঁকি কমে।
রবি মৌসুমে সরিষার জমিতে মৌচাক স্থাপন একটি কম খরচে, কম ঝুঁকির এবং অত্যন্ত লাভজনক উদ্যোগ। সঠিক সময়, পরিমিত মৌচাক ও সচেতন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষক একদিকে যেমন সরিষার ফলন বাড়াতে পারেন, তেমনি বিশুদ্ধ মধু সংগ্রহ করে নিশ্চিত করতে পারেন বাড়তি আয়।