কৃষি ডেস্ক ::
বাংলাদেশে শীতকালীন সবজি বাজারে এখন ব্রকলির ভালো চাহিদা তৈরি হয়েছে। আগে শুধু বড় শহরের

সুপারশপে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতার ঘরেও ব্রকলির ব্যবহার বাড়ছে। ফলন ভালো, পরিচর্যা সহজ আর বাজারদর তুলনামূলক বেশি। সব মিলিয়ে ব্রকলি এখন কৃষকের জন্য লাভজনক এক নতুন ফসল হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
🔳 উপযুক্ত সময় ও জমি নির্বাচন:
ব্রকলি মূলত শীতকালীন সবজি। কার্তিক থেকে পৌষ-এই সময় চাষ করলে ফলন সবচেয়ে ভালো হয়। দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ জমি উপযোগী এবং জমিতে পানি দাঁড়িয়ে থাকা একদম চলবে না। মাটির pH ৬–৭ হলে গাছ দ্রুত বাড়ে ও ফুল বড় হয়।
🔳 জাত ও চারা উৎপাদন:
উন্নত জাতের মধ্যে-Green Magic, Premium Crop, Lucky, Calabrese-চাষ করলে ফলন ভালো হয়।
২৫–৩০ দিনের সবল চারা রোপণ করতে হবে।
রোপণের আগে বীজতলায় হালকা সেচ দিলে চারা শক্ত হয়।
🔳 জমি তৈরি ও রোপণ:
উঁচু জমিতে ১ মিটার চওড়া বেড তৈরি করা ভালো। লাইন থেকে লাইন ১৮-২০ ইঞ্চি, গাছ থেকে গাছ ১৫-১৬ ইঞ্চি দূরত্ব রাখতে হবে।
সন্ধ্যায় চারা রোপণ করলে স্ট্রেস কমে।
🔳 সার ব্যবস্থাপনা (শতকে):
গোবর/কম্পোস্ট: ৮-১০ কেজি, ইউরিয়া: ৩০০ গ্রাম, টিএসপি: ২৫০গ্রাম, এমওপি: ২০০ গ্রাম
টপ ড্রেসিং:
২০-২৫ দিন পরে ½ ইউরিয়া
ফুল আসার সময় বাকি ইউরিয়া + এমওপি
ক্যালসিয়াম–বোরন স্প্রে করলে ফুল শক্ত, ঘন ও বড় হয়
🔳 সেচ ও আগাছা দমন :
৭-১০ দিন পরপর সেচ দিতে হবে, তবে সেচ দিতে হবে বেডের পাশে নালায়, গোড়ায় নয়।
আগাছা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২-৩ বার নিড়ানি যথেষ্ট।
মালচ দিলে পানি কম লাগে এবং আগাছাও কমে।
🔳 রোগ-পোকা দমন:
শুঁয়োপোকা দমনে ফেরোমন ট্র্যাপ বা BT স্প্রে ভালো কাজ করে।
পাতায় দাগ বা ডাউনি মিলডিউ হলে কপার অক্সিক্লোরাইড/ম্যানকোজেব ব্যবহার করা যায়।
এফিড বা মাকড়সা পোকার জন্য সাবান পানি স্প্রে কার্যকর।
জমিতে ট্রাইকোডার্মা ব্যবহার করলে মাটিবাহিত রোগ কম হয়।
ফসল তোলার ১০-১২ দিন আগে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না।
🔳 ফুল গঠন ও সংগ্রহ:
রোপণের ৬৫-৮০ দিনের মধ্যে ফুল সংগ্রহ করা যায়।
ফুলের মাথা ঘন, শক্ত এবং গাঢ় সবুজ হলে তুলতে হবে।
বেশি সময় রেখে দিলে ফুল ঢিলা হয়ে যায়, দামও কমে যায়।
🔳 উৎপাদন :
প্রতি শতকে ৩০-৪০ কেজি
প্রতি বিঘায় ১২-১৬ মণ
🔳 বাজারজাতকরণ:
ছায়ায় রাখলে ব্রকলি দীর্ঘসময় সতেজ থাকে।
প্রয়োজনে পানির স্প্রে করা যায়।
দূরপাল্লায় পাঠানোর সময় বরফসহ প্যাকেজিং করলে নষ্ট হয় না।
আগে থেকেই সুপারশপ-রেস্তোরাঁর সাথে যোগাযোগ করা লাভজনক।
🔳 চাষাবাদের সতর্কতা:
জমিতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না
অতিরিক্ত ইউরিয়া দিলে ফুল ঢিলা হয়।
অপরিপক্ব (২০ দিনের কম) চারা রোপণ নয়।
রোদ-হিমালয়ের প্রভাব বেশি হলে ছায়া জাল ব্যবহার করা যেতে পারে।
একটানা কয়েক বছর একই জমিতে ব্রকলি-ফুলকপি চাষ করলে রোগ বাড়ে। ফসল পরিবর্তন জরুরি।
🔳 বাণিজ্যিক খরচ-লাভ (১ বিঘা জমি):
খরচ খাত (টাকা)
বীজ : ২০০০ টাকা
জমি তৈরি : ৪০০০টাকা
সার-কীটনাশক : ৮০০০টাকা
শ্রমিক : ৭০০০টাকা
সেচ : ২০০০টাকা
পরিবহন/প্যাকেজিং : ২০০০টাকা
মোট খরচ : ২৫০০০টাকা
আয়
বিঘায় উৎপাদন : প্রায় ১৪ মণ (৫৬০ কেজি)
গড় পাইকারি দাম : ৭০-৮০ টাকা/কেজি
৭৫×৫৬০ = ৪২,০০০ টাকা
নিট লাভ
৪২,০০০-২৫,০০০ = ১৭,০০০ টাকা (৬৫-৭৫ দিনের মধ্যে)
সঠিক পরিচর্যায় লাভ আরও বাড়তে পারে।
স্বল্প জমিতে বেশি উৎপাদন, সহজ পরিচর্যা এবং বাজারে ভালো দামের কারণে ব্রকলি এখন কৃষকের জন্য শীতকালীন লাভজনক ফসল। উন্নত জাত, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশন ভালো রাখা-এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই ব্রকলি চাষ থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন