চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
প্রতিটি মানুষের ভিতরে কিছু প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। এমনি এক প্রতিভময়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার নয়াদিয়াড়ী গ্রামের প্রতিবন্ধী মেয়ে মোসাঃ মোয়াজ্জেমা খাতুন তার সেই প্রতিভাকে কাজে লাগিয়েছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তার মুখ থেকেই অনুভূতি আর সাফল্যের ইতিবৃত্ত হুবহু তুলে ধরা হলো:
ছোট বেলা থেকেই আমি খেলাধুলা পছন্দ করি। আমি বাংলাদেশ নারী হুইলচেয়ার ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ও সাভারের পক্ষাঘাত গ্রস্থদের পূর্নবাসন কেন্দ্রিক সিআরপি হুইলচেয়ার নারী বাস্কেটবল দলের একজন প্লেয়ার। আমাদের টিম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে যায় নেপালে। সেই সাথে ইন্দোনেশিয়ার নারী হুইলচেয়ার বাস্কেটবল দলকে পাঁচ ম্যাচ সিরিজে হারিয়ে শিরোপা জিতে দলটি। আমি টেলিভিশনে খেলা দেখলে আমার ভাবিরা বলত, খেলা দেখে কি হবে? তুমি তো কখনো খেলতেই পারবে না, তোমার দ্বারা তো কিছুই সম্ভব না। তখন আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতো! তাদের কথা শুনে মনে মনে ভাবতাম, তোমাদের আমি খেলাধুলা করে দেখিয়ে দিবো যে আমিও পারি! ঠিক তখন থেকেই আমি চেষ্টা করতে থাকি। আমার পরিচিত নারী হুইলচেয়ার বাস্কেটবল দলের খেলোয়াড় মিতুর সাথে এ নিয়ে কথা বললে, সে বলে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানাবে। বেশ কিছু দিন পরে মিতু বাস্কেটবল টিমের কোচ বুলবুল স্যারের নাম্বার সহ আমাকে এসএমএস দিয়ে বলল, আমাদের টিমে নতুন প্লেয়ার নিবে তুমি স্যারের সাথে যোগাযোগ কর। আমি আমার সম্পর্কে বুলবুল স্যারকে সব কিছু বললাম। আমার বাসা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ কারনে তিনি বললেন, যেহেতু তোমার বাড়ি দূরে তাই তোমাকে আমরা এই মূহুর্তে ডাকতে পারছি না। এ কথা শুনে আমি নিরাশ হয়ে গেলাম! এর বেশ কিছু দিন পরে হঠাৎ একদিন বুলবুল স্যার আমাকে কল দিয়ে বললেন, সামনের ১২ তারিখ আমাদের ক্যাম্প আছে তুমি চলে এসো। এ কথা শুনে আমি খুব খুশি হলাম এই ভেবে যে, হয়তো আশার আলো ধরা দিচ্ছে। বিষয়টা বাড়ির সবাইকে জানাতেই অনেক বাঁধা বিপত্তি শুরু হলো। কারণ, তারা সেটা পছন্দ করত না! আমি আম্মাকে খেলার বিষয়ে বললে তিনি আমাকে খেলতে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তাই আমি নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে অর্থাৎ ১১ তারিখ সকাল ৮ টায় সাভার সিআরপির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পরের দিন সকালে আমি আমার ইউনিফর্ম পরে যখন মাঠে যাচ্ছিলাম তখন মনে মনে ভাবছিলাম, আমি কি সত্যিই খেলোয়াড়! মাঠে গিয়ে স্যার আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেখানে আরও নতুন প্লেয়ার আছে। আমি মনে সাহস ও নতুন সহপাঠী পেলাম। স্যার আমাদেরকে খেলাধুলার নিয়মকানুন শিখালেন এবং সিনিয়র সহপাঠীরাও আমাকে সহযোগিতা করলেন। এ ভাবে কয়েকটা টুর্নামেন্ট খেললাম। একদিন হঠাৎ এ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সেলিম রহমান স্যার আমাদেরকে জানালেন, ৫ ডিসেম্বর’১৯ তারিখে মাননীয় স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, মেয়েদের বাস্কেটবল খেলা দেখতে আসবেন। আমি তো সেই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ, আমার এলাকার কোথাও যদি মাননীয় স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী আসেন আমি তো চোখের দেখাটাও দেখতে পাবো না প্রতিবন্ধী বলে! আর সে আমি খেলোয়াড় হয়ে তার হাতে পুরস্কার নিবো! কেন জানি ভাবতেই অবাক লাগছে।
ফাইনাল খেলার দিন আমরা সবাই প্রস্তত হয়ে মাঠে গেলাম। তখন আমাদের দলের একটাই চিন্তা কিভাবে আমাদের দলকে উইনার করা যায়। শেষমেষ, সেই খেলায় আমরা জয় লাভ করি। উইনার হওয়ার সাথে সাথেই সবাই মাঠে এসে আমাদের অভিনন্দন জানাল। সেই মূহর্তটার আনন্দ কি তা বলে শেষ করা যাবে না।মাননীয় স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী যখন আমার হাতে ট্রফি তুলে দিলেন, তখন আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি! কেন জানি মনে হচ্ছে আমি কি সত্যিই পেরেছি? মাননীয় স্পিকারের একটা কথা আমার কানে সব সময়েই বাজে, সেটা হলো- তোমাদের খেলা আমি খুব মনযোগ সহকারে দেখেছি আমি যেন চোখের পলক ফেলতে চাইনি। কারণ, চোখের পলক ফেললে আমি যেন কিছু মিস করে ফেলবো। আমি খুব আনন্দিত হয়েছিলাম, যে আমার প্রথম খেলার প্রথম সম্মানীর টাকায় আমি আমার আম্মাকে শাড়ী উপহার দিতে পেরেছি। আমার আম্মা আমাকে সাপোর্ট না করলে হয়তো আমার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেত।এভাবেই আমার এগিয়ে চলা। আজ এই জায়গায় আসতে আমাকে অনেক বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছে। ২০২০ সালে দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু করোনার জন্য যাওয়া সম্ভব হয়নি।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন