শিরোনাম :
এ্যাজলা-জলজ সবুজ সোনা : কৃষি, প্রাণিখাদ্য ও পুষ্টির সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ ভোলায় স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি বোরহানউদ্দিনে গাঁজা সহ জয়নাল পাটোয়ারী আটক লালমোহনে অবৈধ বালু উত্তোলনব : ড্রেজার মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা চান্দিনায় সংখ্যালঘু নারীকে পিটিয়ে হত্যা চরফ্যাশনে ২ হাজার কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড নির্মাণের ৩৮ বছরেও সংস্কার হয়নি ভোলা বাস টার্মিনাল পরিত্যক্ত ভবন-টিনশেডে পাঠদান : ঝুঁকিতে তজুমদ্দিনের ৭৬ শিক্ষার্থী ভোলা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কার্যালয়ে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ভোলায় এসএসসিতে পাসের হার ৫৩.৭১ শতাংশ : ফলাফলে মেয়েরা এগিয়ে

এ্যাজলা-জলজ সবুজ সোনা : কৃষি, প্রাণিখাদ্য ও পুষ্টির সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ

ড. সরকার আবুল কালাম আজাদ
  • আপডেট সময় : Thursday, August 20, 2026
  • 98 বার দেখা হয়েছে

ড. সরকার মো.আবুল কালাম আজাদ ::

কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমানো, মাটির উর্বরতা ধরে রাখা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বর্তমানে জৈব উপাদানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এমনই একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ হলো অ্যাজলা (Azolla)। পানির ওপর ভেসে থাকা ছোট্ট সবুজ এই জলজ ফার্ন দেখতে সাধারণ শৈবালের মতো হলেও কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় এর রয়েছে বহুমুখী সম্ভাবনা। দ্রুত বংশবিস্তার এবং নাইট্রোজেন সংযোজনের সক্ষমতার কারণে অনেকেই অ্যাজলাকে ‘জলজ সবুজ সোনা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

🔳 এ্যাজলা কী?
অ্যাজলা মূলত একটি ক্ষুদ্র ভাসমান জলজ ফার্ন। পুকুর, ডোবা, ধানক্ষেত কিংবা কৃত্রিম জলাধারের পানির ওপর এটি ভেসে থাকে। উপযুক্ত পরিবেশে অ্যাজলা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অ্যাজলার সঙ্গে Anabaena azollae নামের একটি নীল-সবুজ অণুজীবের সহাবস্থান রয়েছে। এই অণুজীব বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে সহায়তা করে। ফলে অ্যাজলা কৃষিতে নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ জৈব উপাদান হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

🔳কৃষিতে এ্যাজলার গুরুত্ব:
অ্যাজলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো কৃষিজমিতে জৈবসার হিসেবে এর প্রয়োগ। বিশেষ করে ধানক্ষেতে অ্যাজলা ব্যবহার করে মাটিতে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেনের যোগান বাড়ানো যায়। ধানের জমিতে উপযুক্ত পরিবেশে অ্যাজলা ছড়িয়ে দিলে এটি দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং পরবর্তীতে মাটিতে মিশে পচে জৈব উপাদান হিসেবে কাজ করে।
রাসায়নিক সারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে অ্যাজলা সহায়ক হতে পারে। তবে এটি রাসায়নিক সারের সরাসরি বিকল্প নয়; বরং জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করাই অধিক কার্যকর।

🔳মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় এ্যাজলা:
সুস্থ মাটি ছাড়া টেকসই কৃষি সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ ও গুণাগুণ কমে যেতে পারে। অ্যাজলা মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে মাটির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা ও জৈব কার্যক্রম উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
অ্যাজলা সংগ্রহ করে সরাসরি জমিতে প্রয়োগের পাশাপাশি কম্পোস্ট তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়। ফলে কৃষকের খামারে উৎপাদিত একটি জলজ উদ্ভিদ পুনরায় কৃষি উৎপাদনের উপকরণে পরিণত হয়।

🔳ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা:
ধান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ফসল। ধান উৎপাদনে সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধানের জমিতে অ্যাজলা ব্যবহার করলে জমিতে জৈব পদার্থ যোগ হওয়ার পাশাপাশি নাইট্রোজেন ব্যবস্থাপনায়ও সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে ধান রোপণের পর জমিতে অ্যাজলার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিতভাবে বজায় রাখা গেলে এটি মাটির ওপর সবুজ আবরণ তৈরি করে। তবে অ্যাজলার অতিরিক্ত বৃদ্ধি যাতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত না করে, সেদিকে কৃষককে নজর রাখতে হবে।

🔳প্রাণিখাদ্যে এ্যাজলার সম্ভাবনা:
অ্যাজলায় প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকায় এটি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যের পরিপূরক উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের ব্যবহারে অ্যাজলার সম্ভাবনা দেখা গেলেও প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের আগে এর পুষ্টিমান, নিরাপত্তা ও উপযুক্ত মাত্রা বিবেচনা করা জরুরি।
দূষিত পানি, কীটনাশক বা শিল্পবর্জ্যযুক্ত স্থান থেকে সংগৃহীত অ্যাজলা কখনোই প্রাণিখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

🔳মাছ চাষেও কার্যকর :
অ্যাজলা মাছ চাষেও ব্যবহার করা যায়। কিছু মাছ অ্যাজলা খেতে সক্ষম এবং এটি মাছের খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে কাজে লাগতে পারে। পাশাপাশি অ্যাজলা পুকুরের জৈব ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে পুকুরের পানির ওপর অতিরিক্ত অ্যাজলা জমে গেলে সূর্যালোক প্রবেশে বাধা সৃষ্টি এবং পানিতে অক্সিজেনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মাছের পুকুরে অ্যাজলা ব্যবহার করতে হলে পরিমাণ ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

🔳মানবদেহের জন্য এ্যাজলা সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র:

অ্যাজলায় প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড, বিভিন্ন খনিজ ও অন্যান্য জৈব যৌগ থাকার কারণে এটি নিয়ে মানব পুষ্টির সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে নিরাপদ ও প্রক্রিয়াজাত উপায়ে এর কোনো ব্যবহার সম্ভব কি না, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বর্তমানে অ্যাজলাকে মানুষের প্রচলিত খাদ্য বা ওষুধ হিসেবে গ্রহণের বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ নেই। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কাঁচা অ্যাজলা সরাসরি মানব খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। মানবদেহে এর সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

🔳অল্প জায়গায় এ্যাজলা উৎপাদন:
অ্যাজলা উৎপাদনের জন্য বড় জমির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আঙিনা, নার্সারি, খামার এমনকি উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় ছাদেও পানিভর্তি ছোট চৌবাচ্চা বা কৃত্রিম জলাধারে অ্যাজলা উৎপাদন করা সম্ভব।
পানি, তাপমাত্রা, আলো ও পুষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অ্যাজলা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত কিছু অ্যাজলা সংগ্রহ করে ব্যবহার করলে একই জলাধারে আবার নতুন অ্যাজলা উৎপাদিত হতে থাকে।

🔳পরিবেশবান্ধব কৃষিতে এ্যা জলা:
জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির অবক্ষয় এবং কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির সময়ে কৃষিকে আরও টেকসই করা জরুরি। অ্যাজলা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য একটি জৈব সম্পদ হওয়ায় কৃষকের নিজস্ব খামারে উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে।
এটি একদিকে জৈব পদার্থের উৎস, অন্যদিকে প্রাণিখাদ্য ও মাছের খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রাখে। ফলে একটি ছোট জলাধার থেকেও কৃষকের জন্য একাধিক উপকার পাওয়া সম্ভব।

🔳চাষাবাদে প্রয়োজন সতর্কতা
অ্যাজলা যতটা উপকারী, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করলে ততটাই সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত বিস্তার হলে পানিতে আলো ও অক্সিজেনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে। তাই নিয়মিত সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
এ ছাড়া অ্যাজলা উৎপাদনে পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতে হবে। দূষিত পানি বা রাসায়নিক বর্জ্যযুক্ত স্থান থেকে উৎপাদিত অ্যাজলা কৃষি বা প্রাণিখাদ্যে ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে এর ব্যবহার ও প্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ করা উত্তম।

ছোট্ট একটি জলজ ফার্ন হলেও অ্যাজলার সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। জৈবসার, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, ধান চাষ, প্রাণিখাদ্য, মাছের খাদ্য এবং ভবিষ্যৎ পুষ্টি গবেষণা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই অ্যাজলা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।

কৃষকের বাড়ির পাশে একটি ছোট জলাধার থেকেই যদি উৎপাদনযোগ্য জৈব সম্পদ তৈরি করা যায়, তাহলে সেটি কৃষকের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই অ্যাজলাকে শুধু পানির ওপর ভাসমান সবুজ উদ্ভিদ হিসেবে না দেখে ‘জলজ সবুজ সোনা’ হিসেবে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর সময় এসেছে।

লেখক:

সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন

কৃষি লেখক ও কথক বাংলাদেশ বেতার

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত কমেন্টস করুন

https://www.facebook.com

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ সমূহ

নিজস্ব প্রতিনিধি,ভোলা::

মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভোলায় এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। জেলায় মোট ১৪ হাজার ১৯৬ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৭ হাজার ৬২৫ জন।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাসের দিক থেকে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ৩ হাজার ৪৫৯ জন এবং ছাত্রী ৪ হাজার ১৫৬ জন। অর্থাৎ মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি।

জেলায় এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৪০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ১৫৭ জন এবং ছাত্রী ১৮৩ জন। জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় মোট ২২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফল প্রকাশের পর জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তবে সামগ্রিক পাসের হার প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হতাশাও দেখা গেছে। বিশেষ করে গত বছরের তুলনায় এবারের ফলাফলে ভোলায় পাসের হার কমেছে, ফলে সার্বিক ফলাফল নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছে।

ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, সংখ্যার বিচারে শুধু পাসের হারেই নয়, জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে। ফলে জেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় মেয়েদের ধারাবাহিক সাফল্যের বিষয়টি এবারও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে জেলার সামগ্রিক পাসের হার ৫৩ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে আসায় শিক্ষার্থীদের ফলাফল উন্নয়নে বিদ্যালয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ, দুর্বলতার কারণ চিহ্নিতকরণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত কমেন্টস করুন

ভোলায় এসএসসিতে পাসের হার ৫৩.৭১ শতাংশ : ফলাফলে মেয়েরা এগিয়ে