কৃষি ডেস্ক ::
ধান চাষের সফলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আদর্শ বীজতলা তৈরি। উন্নত মানের সুস্থ ও সবল চারা উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি হলো সঠিক মাপ, পর্যাপ্ত গভীরতা, পরিচর্যা-বান্ধব নকশা এবং মৌসুম অনুযায়ী উপযোগী প্রস্তুতি। সঠিকভাবে তৈরি বীজতলা পরবর্তী মূল জমিতে ধানের বৃদ্ধি, ঝড়–বৃষ্টির সহনশীলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ফলন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১. বীজতলার আদর্শ মাপ :
বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BRRI/BINA) এবং মাঠ পর্যায়ের কৃষি নির্দেশিকা অনুযায়ী ধানের বীজতলার আদর্শ মাপ হলো—
দৈর্ঘ্য: ৩ মিটার (প্রায় ১০ ফুট)
প্রস্থ: ১ মিটার (প্রায় ৩ ফুট)
উচ্চতা/গভীরতা: মৌসুমভেদে পরিবর্তনশীল
দুটি বীজতলার মাঝে ফাঁকা (নালা/চলাচলের পথ): ৩০ সেন্টিমিটার
কেন এই মাপ আদর্শ?
১ মিটার প্রস্থ হলে দুই দিক থেকে সহজে পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার ও সেচ দেওয়া যায়।
৩ মিটার দৈর্ঘ্য ব্যবস্থাপনা সহজ রাখে ও বীজতলা সমানভাবে সূর্যালোক পায়।
৩০ সেন্টিমিটার ফাঁকা নালা সেচ ব্যবস্থাকে উন্নত করে এবং শ্রমিকদের চলাচল সহজ করে।
২. মৌসুমভেদে বীজতলার গভীরতা :
বীজতলার গভীরতা চারার শিকড় বিস্তার, পানি নিষ্কাশন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
রবি মৌসুম (শীতকাল)
গভীরতা: ৭–৮ সেন্টিমিটার
এ সময় তাপমাত্রা কম থাকায় বীজ দ্রুত অঙ্কুরোদ্গমে হালকা ও কম গভীর বীজতলা সহায়ক।
পানির স্থায়িত্ব কম থাকে, তাই কম গভীরতা চারাকে রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
বর্ষা মৌসুম (আমান ধান)
গভীরতা: ১০–১৫ সেন্টিমিটার
বর্ষায় অতিরিক্ত পানি জমার ঝুঁকি বেশি, তাই তুলনামূলক গভীর বীজতলা পানি নিষ্কাশনকে সহজ করে।
ভারী বৃষ্টিতে বীজ ধুয়ে যাওয়া ও চারার উৎক্ষেপণ কমাতে গভীরতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. জমি নির্বাচন ও বীজতলা তৈরির আদর্শ বৈশিষ্ট্য :
✔ উচ্চ ভূমি নির্বাচন
বন্যা বা জলাবদ্ধতা এড়াতে সামান্য উঁচু স্থানে বীজতলা আদর্শ।
সরাসরি সূর্যালোক নিশ্চিত হয়, যা চারার কাণ্ড শক্ত করে।
✔ মাটির ধরন
দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি বীজতলার জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
পানি ধারণ ও নিষ্কাশন দু’টিই সঠিকভাবে হয়।
✔ মাটি প্রস্তুতি
জমি ২–৩ বার চাষ ও মই দিয়ে সমান করা।
আগাছামুক্ত ও ঝুরঝুরে মাটি রাখা।
প্রতি শতকে ৫–৭ কেজি পরিমাণ পচা গোবর বা জৈব সার মেশানো।
৪. সার ব্যবস্থাপনা :
প্রতি শতকে (৩৩ ফুট × ৩৩ ফুট) সারের মানদণ্ড—
ইউরিয়া: ৫০–৬০ গ্রাম
টিএসপি: ২৫–৩০ গ্রাম
এমওপি: ২৫–৩০ গ্রাম
ডলোমাইট (প্রয়োজনে): ১০০–১৫০ গ্রাম
জৈব সার (গোবর): ৫–৭ কেজি
সার প্রয়োগের সুবিধা:
সুষম পুষ্টি চারাকে রোগমুক্ত ও সবল করে।
মূল গঠন শক্তিশালী হওয়ায় রোপণের পর দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে।
৫. সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা :
হালকা সেচ দিয়ে বীজতলা সবসময় আর্দ্র রাখা।
বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার জন্য নালা পরিষ্কার রাখা জরুরি।
৩০ সেন্টিমিটার নালা বীজতলার চারপাশে পানি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
৬. পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা :
প্রতিদিন চারার বৃদ্ধি, রঙ ও রোগের লক্ষণ লক্ষ্য করা।
আগাছা দেখা দিলে উত্পাটন করা।
পোকামাকড় আক্রমণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত কীটনাশক বা জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করা।
বীজতলা পলিথিন/জাল দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে ঠান্ডা ও পাখির ক্ষতি কমাতে।
৭. চারা উত্তোলন :
রোপণের ২৫–৩০ দিন বয়সে চারা উত্তোলন উপযুক্ত।
চারার উচ্চতা ১২–১৫ সেমি হলে রোপণের জন্য আদর্শ।
উত্তোলনের আগে বীজতলা হালকা ভিজিয়ে চারা ক্ষতি না করে তুলতে হয়।
লেখক :
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার।
★ উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন