শিরোনাম :
কৃষিপণ্য পরিবহনে চাই নিরাপদ সড়ক জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব  ভোলা জেনারেল হাসপাতাল : ২৫০ শয্যার হাসপাতালে জনবল ১০০ শয্যার বিসিসির ১১ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে জনমত জরিপ : রানা পাল এগিয়ে ক্লু লেস ও চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন : পুরস্কৃত হলেন ঝালকাঠির ওসি (তদন্ত) মেহেদী হাসান, মাদক উদ্ধার ওয়ারেন্ট তামিল করায় পুরস্কৃত হয়েছেন এএসআই বাপ্পি দে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা, উপকূলে তেল-গ্যাসে বিনিয়োগ চান স্পিকার ভোলায় ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক এমপিসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট বিএমজেপি’র বরিশাল জেলা ও মহানগর কমিটির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন  মনপুরায় দিনে-রাতে বিদ্যুৎ মেলে মাত্র দুই ঘণ্টা পে-স্কেল ও পেশাজীবীদের আর্থিক মর্যাদা : বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশনের সেমিনার।। কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

কৃষিপণ্য পরিবহনে চাই নিরাপদ সড়ক

ড. সরকার মো: আবুল কালাম আজাদ
  • আপডেট সময় : Friday, October 2, 2026
  • 50 বার দেখা হয়েছে

ডেস্ক প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশের কৃষকের ঘাম ও শ্রমে মাঠে যে ফসল ফলছে, তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় শুধু উৎপাদন খরচ ও বাজারদরে নয়; উৎপাদিত পণ্য কতটা নিরাপদে, দ্রুত ও কম খরচে বাজারে পৌঁছাতে পারছে তার ওপরেও। তাই কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার আলোচনায় নিরাপদ সড়ক ও কার্যকর কৃষিপণ্য পরিবহনব্যবস্থাকে এখন আর অবকাঠামোগত বিষয় হিসেবে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি কৃষকের আয়, খাদ্য সরবরাহ, ভোক্তার মূল্য এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের বড় অংশ উৎপাদিত হয় গ্রামাঞ্চলে, অথচ প্রধান ভোক্তা ও বৃহৎ বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শহরকেন্দ্রিক। ফলে মাঠ থেকে স্থানীয় হাট, সেখান থেকে উপজেলা বা জেলা শহরের পাইকারি বাজার এবং পরে রাজধানীসহ বড় শহরের বাজারে পণ্য পৌঁছাতে হয়। এই দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বিশেষ করে শাকসবজি, ফল, ফুল ও অন্যান্য পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও গুণগত মান ও বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

🔳সড়ক খারাপ হলে ক্ষতি কৃষকেরই
একটি কৃষিপণ্যবাহী গাড়ি যদি খারাপ সড়কে ধীরগতিতে চলে, যানজটে আটকে থাকে কিংবা অতিরিক্ত ঝাঁকুনির মধ্যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, তাহলে শুধু সময়ই নষ্ট হয় না-পণ্যের ক্ষতি, জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন খরচও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়ে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের ওপর।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি ফল ও সবজি উৎপাদনের সময় কৃষকের প্রধান উদ্বেগ থাকে দ্রুত বাজারজাতকরণ। মাঠে ভালো ফলন হওয়ার পরও যদি কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে না পৌঁছায়, তাহলে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে কৃষককে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারেন। বিপরীতে একই পণ্য শহরের বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হতে পারে। অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার মূল্য ব্যবধানের পেছনে শুধু বাজার ব্যবস্থাপনা নয়, পরিবহন ও অবকাঠামোগত সমস্যাও ভূমিকা রাখে।

🔳বাংলাদেশের বাস্তবতায় গ্রামীণ সংযোগ সড়ক গুরুত্বপূর্ণ
কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে মহাসড়ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘শেষ মাইল’ বা মাঠ থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত যোগাযোগ। অনেক কৃষককে এখনো উৎপাদনস্থল থেকে স্থানীয় বাজারে পণ্য নিতে সরু, কাঁচা বা ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের ওপর নির্ভর করতে হয়।
একটি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের উৎপাদিত সবজি যদি পিকআপ বা ছোট ট্রাকে সহজে উপজেলা বাজারে নেওয়া না যায়, তাহলে বড় মহাসড়ক উন্নত হলেও কৃষকের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয় না। তাই কৃষি উৎপাদন এলাকার সঙ্গে হাট-বাজার, উপজেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়কের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

🔳বিদেশের অভিজ্ঞতা কী বলে?
কৃষিপণ্য পরিবহনে অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্ব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে উপলব্ধি করেছে। নেদারল্যান্ডসের কৃষি ও উদ্যানপণ্য খাতের সাফল্যের পেছনে উন্নত লজিস্টিকস, দ্রুত পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বাজারসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত সময় কমানো এবং পণ্যের মান ধরে রাখাকে তারা কৃষি ব্যবসার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
জাপানেও কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থা, মানসম্মত প্যাকেজিং এবং পরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য গ্রামীণ সড়ক ও বাজারসংযোগ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য কোনো দেশের মডেল হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। আমাদের কৃষির ধরন, জমির আকার, বাজারব্যবস্থা ও পরিবহন কাঠামো বিবেচনা করে নিজস্ব সমাধান তৈরি করতে হবে।
শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়, প্রয়োজন ‘কৃষি লজিস্টিকস’
কৃষিপণ্য পরিবহনের সমস্যার সমাধান শুধু রাস্তা নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। সড়কের পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত যানবাহন, প্যাকেজিং, হিমাগার ও কোল্ড চেইন, সংগ্রহকেন্দ্র, আঞ্চলিক বাজার এবং ডিজিটাল বাজারতথ্য।
বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন বিশ্লেষণে কৃষিপণ্যের পরবর্তী পর্যায়ের ক্ষতি কমাতে উন্নত সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারসংযোগ ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ‘ফসলের পর কী হচ্ছে’ এ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা জরুরি।
নিরাপদ সড়ক মানে শুধু দুর্ঘটনা কমানো নয়
‘নিরাপদ সড়ক’ বলতে আমরা সাধারণত দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, চালকের সতর্কতা, যানবাহনের ফিটনেস ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে বুঝি। কিন্তু কৃষকের দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ সড়কের অর্থ আরও বিস্তৃত। সড়ক হতে হবে চলাচলযোগ্য, টেকসই, যানজটমুক্ত ও কৃষিপণ্য পরিবহনের উপযোগী।
কৃষিপণ্যবাহী যানবাহনের চালকদেরও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। অতিরিক্ত ওজন বহন, অনুপযুক্ত যানবাহন, বেপরোয়া গতি কিংবা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কারণ একটি দুর্ঘটনায় শুধু মানুষের জীবনই ঝুঁকিতে পড়ে না; নষ্ট হতে পারে কৃষকের পুরো চালান।

🔳করণীয় কী?
প্রথমত: কৃষি উৎপাদন অঞ্চলভিত্তিক ‘কৃষি সড়ক মানচিত্র’ তৈরি করা যেতে পারে। কোন অঞ্চল থেকে কোন পণ্য কোন বাজারে যায়, তার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত: গ্রামীণ সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বর্ষা শুরু হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি সড়ক ও কালভার্ট সংস্কার করা গেলে মৌসুমি উৎপাদন বাজারজাতকরণ সহজ হবে।
তৃতীয়ত: কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহকেন্দ্র, প্যাকিং হাউস ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো দরকার। এতে মাঠ থেকে সরাসরি অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ পরিবহন কমবে।
চতুর্থত: উৎপাদন মৌসুমে কৃষিপণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও মহাসড়কে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে, কৃষক, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, স্থানীয় সরকার, কৃষি বিভাগ, সড়ক কর্তৃপক্ষ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো যতটা জরুরি, উৎপাদিত ফসলের মূল্য কৃষকের ঘরে পৌঁছানোও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে উৎপাদন করে যদি দুর্বল পরিবহনব্যবস্থার কারণে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তবে উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্যও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাই কৃষির উন্নয়নকে শুধু জমি, বীজ, সার ও সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘মাঠ থেকে বাজার’ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে কৃষিনীতি ও অবকাঠামো পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
কৃষকের ঘাম যেন সড়কের গর্তে, যানজটে কিংবা পরিবহন সংকটে হারিয়ে না যায় এ লক্ষ্যেই কৃষিপণ্য পরিবহনে নিরাপদ, টেকসই ও কৃষিবান্ধব সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

প্রতিবেদক: সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
সভাপতি
বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন(BPF)
কৃষি লেখক ও কথক বাংলাদেশ বেতার
Ex. সিনিয়র শিক্ষক ও পরীক্ষক(কৃষি শিক্ষা)

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত কমেন্টস করুন

https://www.facebook.com

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ সমূহ