নিজস্ব প্রতিনিধি, ভোলা ::
নাম ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, অথচ জনবলকাঠামো এখনো আটকে আছে ১০০ শয্যাতেই। ভোলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৩০৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৫০ জন। চিকিৎসকদের ৮৮টি পদের ৬৯টিই শূন্য। এর মধ্যে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও অ্যানেসথেটিস্টের কোনো পদেই নেই কর্মরত চিকিৎসক। ফলে প্রতিদিন দেড় হাজারের বেশি বহির্বিভাগের রোগী ও পাঁচ শতাধিক ভর্তি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন, শয্যা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়া-জনবল-সংকটে ভোলার মানুষের চিকিৎসাসেবার চিত্র এখন এমনই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ হাসপাতালে মোট ৩০৪ জন জনবলের স্থলে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫০ জন। শূন্য রয়েছে ১৫৪ জন। এর মধ্যে ১০জন সিনিয়র কনসালট্যান্টের স্থলে তিনজন ও ১৩জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের স্থলে দুইজন কর্মরত আছেন।
চারজন মেডিকেল অফিসারের স্থলে দুইজন কর্মরত আছেন। আটটি ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে আটটি পদই শূন্য রয়েছে। চারজন অ্যানেসথেটিস্টের পদই ফাঁকা। ২৮ জন সহকারী সার্জন/সমমানের স্থলে আছে মাত্র দুইজন। ১০জন রেজিস্ট্রার/সহকারী রেজিস্ট্রারের স্থলে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন।
ভোলা সদরের হাসপাতালটি ২০১৩ সালের মে মাসে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। রোগী ও স্বজনেরা বলছেন, কাগজ-কলমে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা। কিন্তু বাড়েনি সেবার মান। চিকিৎসক ও জনবল নেই ১০০ শয্যারও। হাসপাতালে তীব্র চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। রোগীরা সময়মতো চিকিৎসাসেবা নিতে পাচ্ছেন না।
৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত ডা. ইরফান মাহমুদ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ইনজেকশন ও স্যালাইন পুশ করার কিছুক্ষণ পর হাতে ক্যানোলা নিয়েই রোগী দেখতে হয়েছে তাঁকে। একদিকে নিজের শরীরে স্যালাইন, অন্যদিকে মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তাঁর প্রশংসা করেন। পাশাপাশি চিকিৎসক-সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় অনেককে।
সম্প্রতি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। এদের মধ্যে কেউ শিশু কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ভর্তি রোগীরও উপচে পড়া ভিড়। শয্যা না পেয়ে ডেঙ্গু ও হামসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
বহির্বিভাগের সামনে লাইনে থাকা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের ৩নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মেহের আফজিন বলেন, তিনি কৃমি ও কাশি রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। সকাল ৯টায় এসে দীর্ঘ সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও দুপুর পর্যন্ত ডাক্তার দেখাতে পারেননি।
ইলিশা ইউনিয়নের জংশন এলাকার বাসিন্দা মিনারা বেগম দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার ৯ বছরের মেয়ে মায়েশার দাঁত ব্যথার কারণে তাকেসহ দুই সন্তান নিয়ে হাসপাতালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু বেলা সাড়ে ১১টায়ও চিকিৎসককে দেখাতে পারিনি।’
ডেঙ্গু ও হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, বহু রোগী মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স সুমা রানী ও হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স সমাপ্তি দাস জানান, শয্যা-সংকটের কারণে বহু রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। নার্স ও চিকিৎসক-সংকটের কারণে এসব রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘জেলার ২০ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল এ হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ইনডোরে সাড়ে ৫০০ ও আউটডোরে দেড় হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নেয়। এখানে চিকিৎসকসহ তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। এতে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জনবল-সংকটের বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
আপনার মতামত কমেন্টস করুন