অনুসন্ধান ডেস্ক ::
বরিশাল নগরীর দক্ষিণ চকবাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতনের আলোচিত সেই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে দায়ের হওয়া মামলায় আজ জুডিশিয়াল তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ-হেল-মাফির আদালতে এ তদন্তকার্য সম্পন্ন হয়। এর আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিজ্ঞ বিচারক জেলা ও দায়রা জজ মো. রকিবুল ইসলাম এর নির্দেশে কোতয়ালী থানার এসআই মো. আবদুল কুদ্দুস মোল্লাকে মামলার তদন্তভার দেয়া হলেও তিনি নির্যাতনের শিকার আখি আক্তারকে নির্যাতনের ঘটনা থেকে উদ্ধারকারী পুলিশের সহকারী কমিশনার প্রনয় রায়ের বদলীর জন্য দীর্ঘ ৭ মাস অপেক্ষার পর গত ২২ জুলাই তারিখে বাদীসহ কোন প্রতক্ষ্যদর্শী স্বাক্ষীকে তলব ছাড়াই একতরফা মনগড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষে এ্যাড. হুমায়ুন কবির-১ এর নেতৃত্বে এ্যাড. মাজহারুল ইসলাম সেরনিয়াবাত(জাহান) এবং এ্যাড. গৌরাঙ্গ চন্দ্র শীল কঠোর চ্যালেঞ্জ করে জুডিশিয়াল তদন্ত দাবী করলে বিজ্ঞ বিচারক তা মঞ্জুর করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন।
আশ্চর্যের বিষয়, তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ-হেল-মাফি সকাল ১১ টা থকে শুরু করে কোনরকম লাঞ্চব্রেক না দিয়েই অভূক্ত অবস্থায় তাঁর বেঞ্চ সহকারী রঞ্জন হালদার ও অন্যান্য সহযোগীদের নিয়ে দিনভর অত্যন্ত ধৈর্য ও মনযোগের সাথে বাদী ও স্বাক্ষীদের কথা শুনেন এবং জেরা করেন। বাদী ও স্বাক্ষীগন সারাদিন টানা দাঁড়িয়ে থেকেও ম্যাজিস্ট্রেটের এমন আন্তরিকতাপূর্ণ চুলচেরা আদ্যাপান্ত জিজ্ঞাসাবাদে কোন ক্লান্তিবোধ করেননি বলে মামলার বাদী ও স্বাক্ষীগণ এ প্রতিনিধির কাছে স্বীকার করেন।
অপরদিকে, এসআই কুদ্দুসের অসহযোগিতামূলক আচরণ এবং দুর্নীতির আশ্রয়ে এক তরফা মনগড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দাখিলে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিএমপি কমিশনারের নিকট লিখিত অভিযোগ জানিয়ে পুলিশের আইজিকেও অনুলিপি দিয়েছেন মামলার বাদী আখি আক্তার।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, বরিশাল মহানগরীর বেলতলা এলাকার চর আবদানীর বাসিন্দা মোঃ আলমগীর হোসেন ও মিনারা বেগম দম্পতির বড় মেয়ে মোসাঃ আখি আক্তার(২২) এর সাথে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামচরীর বাসিন্দা মোঃ ইউসুফ আলী ফরাজীর ছোট ছেলে মোঃ সোলাইমান এর ইসলামী শরা শরিয়ত মোতাবেক রেজি:

কাবিনমূলে ২০২০ সালের ২৩ মার্চ বিবাহ হয়। কিন্তু বিয়ের পর বেকার সোলাইমানের পৈতৃক বাড়িতে আশ্রয় না হওয়ায় স্ত্রীকে নিয়ে শশুর বাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন। আখির বাবা মায়ের পুত্র সন্তান না থাকায় জামাতাকেই পুত্র স্নেহে আশ্রয় দিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে নগরীর দক্ষিণ চকবাজারে “সুলায়মান সু হাউজ” নামে একটি জুতার দোকান দিয়ে দেন। কিন্তু ব্যবসায়ের ১ বছর উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও আখির সংসারে একটি টাকাও খরচ করেননি সোলাইমান। অথচ পার্শ্ববর্তী বড় ভাই লোকামানের জুতার দোকান এবং বিবাহিতা বোন আখি বেগমের পেছনে দুহাত উজার করে টাকা খরচ করার ঘটনায় পারিবারিক দ্বন্দের সূত্রপাত ঘটে। উল্টো আরো ৫ লক্ষ টাকা বাবার নিকট থেকে এনে দিতে স্ত্রী আখি আক্তারকে চাপ প্রয়োগ করেন সোলাইমান। আখি তা এনে দিতে অস্বীকার করায় সম্পর্কে ফাটল ধরে তীব্র আকারে। শুরু হয় আখির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। স্বামীর অত্যাচারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় পিতা মাতার সহযোগিতায় সন্তান সম্ভবা আখির অকালে সিজার করা হয় গত বছরের ১২ আগষ্ট নগরীর কালীবাড়ি রোডে বরিশাল মেট্রোপলিটন হাসপাতালে। অপুষ্ট পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হলে চিকিৎসকের নির্দেশনায় শেবাচিম হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলে পরদিন ভোরে শিশুটি মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনার পর পরই সোলাইমান নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সোলাইমানের বড় ভাই লোকমানসহ অন্যান্য স্বজনরা আখিকে তালাকের এবং আখির বাবা আলমগীর হোসেনকে মারধর ও প্রাননাশক হুমকি দেয়ায় বরিশালের বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে গত বছরের ২২ আগষ্ট ১০৭/১১৭(গ) ধারায় সোলাইমান সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে এমপি নং- ৬৪২ নালিশী মামলা করেন।
ওই মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে কৌশলে ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর স্ত্রী আখি আক্তারকে তালাক দিয়ে তা গোপন রেখে গৌরনদীর ভুয়া ঠিকানায় তালাকের কপি পাঠিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে সোলাইমান আখিকে তার পিত্রালয় থেকে লামচরী গ্রামের নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। অত:পর ১৩ সেপ্টেম্বর সোলাইমান তার বাবা ইউসুফ সহ আরো দু’জন আপন চাচাকে নিয়ে শশুর আলমগীরের চর আবদানীর বাসায় বেড়াতে এসে রাত যাপন করেন এবং বিদ্যমান নালিশী মামলাটি নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। পরদিন ১৪ অক্টোবর মামলাটি বাদীপক্ষে উত্তোলন করার পরপরই তাদের চরিত্র পাল্টে যায়। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়েই ২ ডিসেম্বর পূনরায় তালাকের চূড়ান্ত নোটিশটিও স্ত্রী নিজ বাড়িতে থাকা সত্বেও গৌরনদীর ভুয়া ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়ে তা গোপন রাখেন সোলাইমান। অপরদিকে, বরিশাল শহরে বাসা ভাড়া নেয়ার কথা বলে ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার বাবার মাধ্যমে স্ত্রী আখিকে তার পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দেন।
অবাক করার বিষয়, ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ৯৯ দিন আখিকে তার স্বামী সোলাইমানের জিম্বায় রেখে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখলেও সোলায়মান তার আইনজীবী মো: শহিদ হোসেনের মাধ্যমে গত বছরের ১০ নভেম্বর বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দাখিলকৃত লিখিত বর্ননায় তালাকের বিষয়টি উল্লেখ না করে প্রতারণার অবতারণা করে সুচতুরতার পরিচয় দিয়ে গৌরনদীর ভুয়া ঠিকানায় তালাকের দু’টি নোটিশ পাঠিয়ে তালাকের বিষয়টি গোপণ করেছেন। সোলাইমানের চালাকির বিষয়টি কাউনিয়া থানার গত ১৮ আগষ্টের ৭৭৫ জিডির পরিপ্রেক্ষিতে আনিত নন এফআইআর মোকদ্দমা নং-৬২/২০২৫ এর প্রতিবেদনেও সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয়েছে।
অপরদিকে, শহরে বাসা ভাড়ার বিষয়ে কথা বলার জন্য সোলাইমানের কথামত ২৭ ডিসেম্বর দুপুরে তার দোকানে গেলে যৌতুকের কথিত বাকী ৫ লক্ষ টাকার দাবী নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সোলাইমান আখির ওপর চড়াও হন এবং প্রচন্ড মারধর করে অজ্ঞান করে ফেলেন। এ এসময়ে বিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ের স্টাফ অফিসার সহকারী পুলিশ কমিশনার প্রনয় রায় আখিকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধারপূর্বক লঞ্চঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাহবুব আলমের মাধ্যমে গ্রেফতারপূর্বক হাতকড়া পড়িয়ে কোতয়ালী থানায় সোপর্দ করেন।
এ সময়ে সোলাইমানের হাতে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে থানায় নেয়ায় সোলাইমানের বড় ভাই লোকমান ফরাজী এবং তার সাথে থাকা কয়েকজন বখাটে ছেলে এসআই মাহবুবকে উদ্দেশ্য করে ঔদ্ধত্যপূর্ন আচরণ ও হুমকি দিয়ে বলে, আমরা চাইলে এখনই পাঁচশ লোক জড়ো করে থানা ঘেরাও করে উড়িয়ে দিতে পারি। এ হুমকির ভয়ে থানায় মামলা না নিয়ে তাৎক্ষণিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় এসআই মাহবুবের মাধ্যমে সোলাইমানের হ্যান্ডকাপ খুলে একটি জিডি করেন থানা কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনা খুব কাছে থেকে অনলাইন এক্টিভিস্ট অনুসন্ধান টিভিনিউজের প্রকাশক ও সম্পাদক শিশির মজুমদার প্রত্যক্ষ করলেও প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেন নিষ্ক্রিয় পুলিশদের নিরব ভূমিকা এবং লোকমানের নেতৃত্বে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের প্রভাবের কারণে।
এ ঘটনায় ওই দিন থানায় ১৬৯৮ নং জিডি এবং গত ১ জানুয়ারী বরিশালের বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্বামী সোলাইমান সহ ৫ জনকে আসামী করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধিত) ২০০৩ এর ১১(গ)/৩০ ধারায় ৩৬৪/২০২৫(কোতয়ালী) মামলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে আখি আক্তারের স্বামী মো: সোলাইমানের মোবাইল ফোনে 01719541613 ও 01919079090 নম্বরে বারং বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ইতোপূর্বেও এসব ঘটনাবলীর আলোকে অনুসন্ধান টিভিনিউজ এ গত ১২ আগষ্ট একটি সবিস্তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন