অনুসন্ধান প্রতিবেদন ::
বরিশাল নগরীর দক্ষিণ চকবাজারে গণচলাচলের রাস্তার ওপর ফেলে প্রকাশ্যে স্ত্রীকে পেটানোর সেই আলোচিত ভাইরাল ঘটনার বিষয়ে বরিশালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিজ্ঞ বিচারক জেলা ও দায়রা জজ মো. রকিবুল ইসলাম এর নির্দেশে মামলার তদন্ত করছেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ-হেল-মাফি। তিনি ইতোমধ্যেই উভয়পক্ষের স্বাক্ষীদের জবানবন্দি নিয়েছেন। ঘটনাস্থলের স্পট ভিজিট করবেন বলেও জানিয়েছেন পক্ষদ্বয়কে। এরপরই রাতারাতি শুরু হয়ে গেছে প্রথম ঘটনাস্থল ভিকটিমের স্বামী ১ নং আসামীর দোকানের সাইনবোর্ডে নাম পরিবর্তনের নাটক! দোকানের সাইন বোর্ডে “সোলাইমান সু হাউজ” নাম পরিবর্তন করে “লোকমান সু হাউজ” লাগিয়েছেন।
গত ৬ অক্টোবর নোটিশ দিয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ-হেল-মাফি তাঁর আদালতে উভয় পক্ষের স্বাক্ষ্য নেন। তিনি সরেজমিনে স্পষ্ট ভিজিট করবেন জেনে ওইদিন রাতেই স্ত্রী আখি আক্তারকে নির্যাতনের মামলার ১ নং আসামী মো: সোলাইমান ফরাজী তার নিজ নামীয় দোকানের নাম পরিবর্তন করে বড় ভাই মো: লোকমান ফরাজীর নামে সাইনবোর্ড তৈরি করে সেঁটে দেন। উল্লেখ্য, সোলাইমানের দোকানের সাথেই তার ভাই লোকমানের “লোকমান সু হাউজ” নামীয় দোকানটিও অবস্থিত। লোকমান ওই মামলার অন্যতম আসামী।
তিনি তার দোকান থেকে জিআই পাইপ সোলাইমানকে দিয়ে স্ত্রী আখিকে পেটাতে সহযোগিতা করেছিলেন বলে প্রতক্ষদর্শী বাহাদুর এ প্রতিনিধির কাছে স্বীকার করেন।
তবে রাতারাতি দোকানটির নাম পরিবর্তণের বিষয়টি রহস্যাবৃত। অসমর্থিত একটি সূত্রের দাবী, সোলাইমান মামলার দায় এড়াতেই গোপনে বিদেশ পাড়ি দিতে বা আত্মগোপণে যেতে এমন কৌশল অবলম্বন করছেন।
অপরদিকে, “লোকমান সু হাউজ”এর স্টলটি জেলা পুলিশের সম্পদ হওয়ায় দোকানটির চুক্তিনামা শর্তে অগ্রিম বাবদ জমা দেয়া ৫ লক্ষ টাকা সোলাইমান যাতে তুলে নিতে না পারে সেজন্যে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(প্রশাসন ও অর্থ) বরাবরে গত ২৩ জানুয়ারি এবং ১২ মে পরপর ২ টি আবেদনের নাধ্যমে আপত্তি জানান নামলার বাদী আখি আক্তার।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নির্বাহী আদালতের “আর” আদ্যাক্ষরযুক্ত জনৈক বেঞ্চ সহকারির এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বাসায় সপরিবারে ভাড়া থাকেন আসামী লোকমান ফরাজী। সেই সুবাদে আসামীপক্ষে তদ্বিরেও কাজ করছে ওই মহলটি। সম্প্রতি সোলাইমানও তদ্বিরের স্বার্থে ওই বাসায় বসবাস করতে শুরু করেছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, সোলাইমান ও লোকমান লামচরীর পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে বাবা মা ও এলাকাবাসী যাতে মামলার বাদী আখি আক্তারকে তালাকের পরে তা গোপন রেখে গত বছরের শীত মৌসুমে অর্থাৎ ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বামী সোলাইমান আখিকে নিয়ে তার বাবার বাড়িতে দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন কিংবা আমলী আদালতে ১০৭/১১৭(গ) ধারার মামলা নিষ্পত্তির স্বার্থে সোলাইমান তার পিতা ও দু’জন আপন চাচাকে নিয়ে ১৩ অক্টোবর চর আবদানী আখির বাবার বাসায় এসে মিমাংসা বৈঠকে মিলিত হয়ে সেখানে রাত যাপন করেছেন এই মর্মে কোন আলামত বা স্বাক্ষী প্রমান তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট না পান সেই প্রভাব খাটাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে।
প্রকাশ যে, গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দুপুরে সোলাইমান স্ত্রী আখি আক্তারকে খবর দিয়ে নগরীর দক্ষিণ চকবাজারস্থ তার দোকান “সোলাইমান সু হাউজ” এ ডেকে নিয়ে যৌতুকের কথিত বাকী ৫ লক্ষ টাকার দাবী নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে লোকমান আখির ওপর চড়াও হন এবং প্রচন্ড মারধর করে অজ্ঞান করে ফেলেন। এ এসময়ে বিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ের স্টাফ অফিসার সহকারী পুলিশ কমিশনার প্রনয় রায় আখিকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধারপূর্বক লঞ্চঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাহবুব আলমের মাধ্যমে গ্রেফতারপূর্বক হাতকড়া পড়িয়ে কোতয়ালী থানায় সোপর্দ করেন। এ ঘটনায় ওই দিন থানায় ১৬৯৮ নং জিডি এবং গত ১ জানুয়ারী বরিশালের বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্বামী সোলাইমান সহ ৫ জনকে আসামী করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধিত) ২০০৩ এর ১১(গ)/৩০ ধারায় ৩৬৪/২০২৫(কোতয়ালী) মামলা হয়।
এ ছাড়াও সোলাইমান গংদের বিরুদ্ধে বরিশালের বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে সিআর ৫৮/২০২৫(কাউনিয়া), নন-এফআইআর প্রসিকিউশন নং- ৬৩/২০২৫ (কোতয়ালী) এবং নন-এফআইআর প্রসিকিউশন নং- ৬২/২০২৫ (কাউনিয়া) মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এদিকে, আখি আক্তারের সাথে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা ধামাচাপা দিতে গত ৩১ আগষ্ট সোলাইমান তার আইনজীবীর মাধ্যমে আখিকে উকিল নোটিশ দিলে নোটিশটি ১৩ অক্টোবর ডাক বিভাগের মাধ্যমে আখির হাতে পৌঁছায়। নোটিশটির প্রেরক ও প্রাপকের ঠিকানার মধ্যে মাত্র ২ কি.মি. দূরত্বের ব্যবধান হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান এ যুগেও সেটি পৌঁছাতে সময় লেগেছে ৪৩ দিন। নোটিশ পৌঁছানোর এই দীর্ঘ সময়ের নাটকীয় প্রভাকান্ড সহ আখি তার সাথে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার ৮ টি ধাপে সুস্পষ্ট কড়া জবাব দেন সিনিয়র আইনজীবী মো. হুমায়ুন কবির-১ এর মাধ্যমে পরদিন ১৪ অক্টোবর বরিশাল প্রধান ডাকঘরের এডি-৭২৬ নং নিবন্ধিত পত্রযোগে।
মো: সোলাইমান ফরাজী(৩৫) নগরীর কাউনিয়া থানাধীন চর বাড়িয়া ইউনিয়নের লামচরী গ্রামের বাসিন্দা মো: ইউসুফ আলী ফরাজী ও মোসা: পেয়ারা বেগম দম্পত্তির পুত্র এবং মোসা: আখি আক্তার(২২) একই ইউনিয়নের চর আবদানীর বাসিন্দা মো: আলমগীর হোসেন ও মোসা: মিনারা বেগম দম্পত্তির কন্যা।
ঘটনার বিষয়ে জানতে আখি আক্তারের স্বামী মো: সোলাইমানের মোবাইল ফোনে 01719541613 ও 01919079090 নম্বরে বারং বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ইতোপূর্বেও এসব ঘটনাবলীর আলোকে অনুসন্ধান টিভিনিউজ এ গত ১২ আগষ্ট এবং ৬ অক্টোবর দু’টি সবিস্তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন