ভুয়া ঠিকানার কারণে আইন ও প্রশাসনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে প্রতারক সম্রাট নলছিটির শাহআলম : অন্ত:রালে লাখ টাকার মিশন

পি.সি মজুমদার শিশির
  • আপডেট সময় : Wednesday, January 29, 2020
  • 1060 বার দেখা হয়েছে

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন)পরিচয়ে ইটের ভাটায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হয়ে বরগুনার জেল-হাজতে ঠাঁই হওয়া কুখ্যাত চাঁদাবাজ সেই শাহআলমকে রক্ষা করতে অবশেষে একটি সুবিধাভোগী মিশন ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মগোপনের সুযোগ করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর এর অন্ত:রালে রয়েছে লক্ষ টাকা দেনদরবারের গোপন রহস্য। সোমবার(২৭ জানুয়ারি) জেল-হাজত থেকে জামিনে বের হয়েই ফের ওই সিন্ডিকেটটিকে প্রভাবিত করে আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলমান প্রতারণার মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টায় নানা দেনদরবার শুরু করে দিয়েছেন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মিডিয়াঙ্গনে বর্তমান সময়ের সবচে’ বিতর্কিত ও সমালোচিত, ঠিকানা ও সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে ডিক্লেয়ারেশনপ্রাপ্ত আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা দৈনিক বরিশাল ক্রাইম’র কথিত সম্পাদক-প্রকাশক এইচ এম শাহআল শাহ্।

উল্লেখ্য, গত ২৬ ডিসেম্বর আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নে চালিতাবুনিয়া ইব্রাহীমপুর মেসার্স এমএসবি ব্রিকস এ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক(প্রশাসন) পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করতে গেলে স্থানীয় জনতা শাহআলমকে আটক করে গনপিটুনি দিয়ে আমতলী থানায় সোপর্দ করে। এ ঘটনায় ভাটার ম্যানেজার মোঃ মাসুদ হাসান বাদী হয়ে ওই দিন শাহআলমের বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয় ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ৪০৬/৪১৯/৪২০ দঃ বিঃ আইনে আমতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করলে আসামীকে বরগুনা জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।

বিবরণে প্রকাশ, শাহআলম ঝালকাঠীর নলছিটি উপজেলার ৯ নং দপদপিয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড পশ্চিম কয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবদুর রহমান হাওলাদারের পুত্র। ওই ঠিকানার ভোটার তালিকায়ই শাহআলমের নাম অন্তর্ভুক্ত এবং জাতীয় পরিচয়পত্র। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া নিজ বাড়িতেই স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করেন শাহআলম। কিন্তু তিনি তার প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা গোপন রেখে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ২৫ ওয়ার্ডে রূপাতলী হাউজিং এলাকার খানবাড়ি নামের একটি ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বরিশালের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দৈনিক বরিশাল ক্রাইম পত্রিকার ডিক্লেয়ারেশন নেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল বরিশাল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে “ফরম-বি”-তে দেয়া এক হলফনামায় শাহআলম ওই ভুয়া ঠিকানার কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়াও ২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী বরিশাল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (নিবন্ধন) বরাবরে নির্ধারিত ছকপত্রে শাহআলমের দাখিলকৃত আবেদনেও ওই ভুয়া ঠিকানার কথা উল্লেখ করেছেন। ছকপত্রের ওই আবেদন দু’টিতে ভুয়া ঠিকানা ছাড়াও তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাশ দেখিয়েছেন। অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে সব তথ্য-উপাত্তে মিলেছে তাতে জানা যায়, শাহআলম জুনিয়র মাধ্যমিকের গন্ডিও অতিক্রম করতে পারেননি। একই আবেদনে তিনি ১২ বছরের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র প্রকাশণা সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে সংগৃহিত সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে মিডিয়ামহলে। তবে সংবাদ লেখার প্রতিযোগিতায়ও তার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা টিকবে কী না তীব্র সন্দেহ পোষণ করছেন বরিশালের মিডিয়া পার্সনরা। এ বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বরিশাল জেলা প্রশাসক বরাবরে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ উত্থাপন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে শাহআলমের বিরুদ্ধে বিষাদাগারে ফুঁসে উঠছে মিডিয়াঙ্গন। এ কারণে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তিনি বারবার গনপিটুনী খেলেও মিডিয়াপক্ষ থেকে কেউ টু-শব্দটি পর্যন্ত করেন না।

অপরদিকে, প্রতারনা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আমতলী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারাধীন জি.আর.ও-২৪৯/১৯ (আমতলী থানার মামলা নং-১৫) নম্বর মামলায় শাহআলম তার ঠিকানা উল্লেখ করেছেন বাকেরগঞ্জ পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ড আজিমপুর গ্রাম। উল্লেখ্য, ওই ঠিকানায় শাহআলমের দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা বেগম তার সাবেক স্বামীর ঔড়সজাত সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন এবং এটি আনোয়ারা বেগমের পৈত্রিক সম্পত্তি। প্রৌঢ় শাহআলম-আনোয়ারা দম্পত্তির কোন সন্তানাদি নেই। আইনের গ্যারাকল থেকে এড়াতে শাহআলম মাঝমধ্যে এ ঠিকানায় আত্মগোপন করেন।

জানা গেছে, আমতলী থানার মামলার বিষয়ে শাহআলমের ঠিকানার তথ্য সংগ্রহে ‘ইনকোয়ারী-স্লিপ’ পাঠালে নলছিটি এবং বাকেরগঞ্জ উভয় থানা থেকেই তার ঠিকানা সঠিক বলে রিপোর্ট দিয়েছে। এবিষয়ে জানতে চাইলে বাকেরগঞ্জ থানার এএসআই নজরুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, শাহআলম এখানকার ভোটার তো ঠিকানা লিখতে সমস্যা কী? স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ নাসির উদ্দীন নান্নু বলেন, শাহআলমের বাড়ি কয়া গ্রামে তা আমি জানি, তবে তিনি এখানে বিয়ে করেছেন বহু বছর আগে। তাছাড়া শাহআলমের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার। সে হিসেবে তিনি একটা বাসিন্দা সনদ চাইলে না দিয়ে পারা যায় না। অবশ্য সেক্ষেত্রে অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সনদ প্রাপ্য কিন্তু আমি কোনো সনদ দিয়েছি কী না আমার মনে নেই।

অপরদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, শাহআলম অত্যন্ত ধূরন্ধর ও বিচিত্র চরিত্রের একজন ব্যক্তি। তার বিরূদ্ধে অনেক থানায় মামলা-অভিযোগ রয়েছে কিন্তু সুচতুর শাহআলমের ব্যবহৃত একাধিক ও ভুয়া ঠিকানার কারণে আইন ও প্রশাসন তাকে ছুঁতেও পারে না। তাই কোনো থানার পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। আর এ কারণে কোনো থানার পুলিশ হানা দিলে তাকে সহজে খুঁজে বের করতে পারে না। সূত্রটির দাবি, চলমান মামলা থেকে আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে শাহআলম কোনোভাবে বেরিয়ে গেলে তিনি হবেন একজন সফল ও সার্টিফাইড চিটার।

উল্লেখ্য, শাহআলমের বিরুদ্ধে বরিশাল চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৪০৬/৪২০ দঃবিঃ আইনে প্রতারণার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভিজিটর পরিচয়ে একটি মাদ্রাসায় হানা দিয়ে চাঁদাবাজির চেষ্টাকালে আটক হলে আওয়ামী ঘরানার নেতাদের সুপারিশে ছাড়া পেলেও উজিরপুর থানায় একটি জিডি হয়। তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন থানায় অসংখ্য জিডি ও অভিযোগ।

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত কমেন্টস করুন

https://www.facebook.com

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ সমূহ