যশোরের ঐতিহ্যবাহী চিত্রা নদী এখন ময়লার ভাগার! পরিবেশ রক্ষায় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এলাকাবাসীর

পরিমল বিশ্বাস, বাঘারপাড়া(যশোর)
  • আপডেট সময় : Wednesday, February 5, 2020
  • 798 বার দেখা হয়েছে

জেলার বাঘারপাড়ার খাজুরা বাজারের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী চিত্রা নদী। ২০১৮ সালে বাজারের যানজট নিরসন ও হাটার জন্য নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেই ওয়াকওয়ের উপরেই ফেলা হচ্ছে বাজারের ময়লা-আবর্জনা। দেখলে মনে হয় নদী নয় এটা যেন ময়লা ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে দূষিত হচ্ছে বাজার, নদী ও তার পার্শ্ববর্তী দু’টি স্কুলের পরিবেশ। বাতাসে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের রোগব্যাধি। জনস্বাস্থ্যের ওপর যা রীতিমত হুমকি স্বরূপ। পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে কেন্দ্রীয় মসজিদ ও ঈদগাহের। দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। এদিকে বাজারটি প্রতি বছরে প্রায় কোটি টাকায় ইজারা হলেও এ বছর হয়েছে তার অর্ধেক। তবে তা বাজার উন্নয়নে ব্যবহার হচ্ছে না বলে জানিয়েছে হাট ইজারা কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে বাজারটি ঘুরে দেখা গেছে, শহরতলি ও বাঘারপাড়া উপজেলা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দুরে চিত্রা নদীর পাড়ে ২০০ বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী এ বাজারটির অবস্থান। সদর ও বাঘারপাড়ার ৫টি ইউনিয়নের মানুষের ব্যবসার মূল কেন্দ্রবিন্দু খাজুরা। দেশের দক্ষিনাঞ্চলের ধান-পাট, সব্জি ও চাউলের অন্যতম মোকাম বাজারটি। সপ্তাহের প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার এখানে হাট বসে। এ দু’দিন বাজারে সর্বত্র যানবাহন ও মানুষের তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। সে কারণে ২০১৮ সালে যানজট নিরসন ও এলাকাবাসীর দুর্ভোগ পোহাতে নদীর প্রেসঘাট থেকে ব্রীজঘাট পর্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এই ওয়াকওয়ের উপর বাজার ও বাসা-বাড়ীর বিভিন্ন বর্জ্য, সাপ্তাহিক দু’হাটের সকল ময়লা আবর্জনা ফেলায় বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এর একেবারে সন্নিকটেই কেন্দ্রীয় মসজিদ, ঈদগাহ, ২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য বাসা-বাড়ি। দুর্গন্ধ এড়াতে দিনের বেলায় আবর্জনার স্তুপে আগুন দেওয়াতে ধোঁয়া আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে চারিদিক। ওয়াকওয়েতে চলাচল করতে নাকে রুমাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকাবাসীর যেন দুর্ভোগের অন্ত নেই। কেউ কেউ বিদ্রুপ করে চিত্রা নদী এখন বাজারের অঘোষিত ডাম্পিং জোন বলে আখ্যা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম ফারুক, মাসুম রেজা খান, নারায়ন অধিকারীসহ অনেকেই বলেন, শীত-গরমে আমরা নদীর পাড়ে বসে বিশ্রাম করি। আবার স্বাস্থ্য সচেতন বিভিন্ন বয়সের অনেকেই শরীর ভালো রাখার জন্য এ ওয়াকওয়েতে নিয়মিত হাটাহাটি করে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী চলাচলের বিকল্প পথ এটি। তবে নদীর পাড়ে এভাবে ময়লা ফেলার কারণে দূর্গন্ধে আর চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না।

নদীর পাড়ে বাসা-বাড়ীর বর্জ্য ফেলার ব্যাপারে লাবনী রায়, যমুনা মজুমদার ও আলেয়া বেগমসহ একাধিক গৃহবধুর সাথে কথা বললে তারা উল্টো এ প্রতিবেদকে প্রশ্ন করে বসেন। তারা বলেন, ময়লা ফেলার কোন ব্যবস্থা না থাকলে ফেলবো কোথায়? তাদের দাবী পৌরসভার মত বাজারের বিভিন্ন প্রান্তে ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা হোক। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সেখান থেকে গাড়িতে করে ময়লা নিয়ে বাজারের অদুরে নির্দিষ্ট একটি স্থানে গিয়ে ফেলবে।

এ ব্যাপারে টিপিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দশরত কুমার ও মাখনবালা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিয়ার রহমান জানান, ময়লার ভাগাড়ের কারণে ধোঁয়া ও দূর্গন্ধে দরজা-জানালা বন্ধ করেই ক্লাস নিতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার পরিবেশ পাচ্ছে না। অনেক অভিভাবক এ স্কুলে থেকে তাদের সন্তানকে নিয়ে গিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি করাচ্ছে। বর্তমানে এ সমস্যাটি প্রতিষ্ঠানের পড়ালেখার মান ও পরিবেশ নষ্টের কাল হয়ে দাড়িয়েছে।

খাজুরা ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, গত ২০১৬ সালে বাজার কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণের পর এখনো নতুন কোন কমিটি গঠন করা হয়নি। যে কারণে বৃহৎ এ বাজারটি পরিচালনায় সঠিক তদারকি হচ্ছে না বলে জানান তিনি। এদিকে বাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মী পুষ্প জানান, ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কোন জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের এখানে ময়লা ফেলতে হচ্ছে।

ময়লা ফেলার ব্যাপারে হাটের বর্তমান ইজারাদার সাইফুজ্জামান চৌধুরী ভোলা জানান, আমি সরকারের নিকট থেকে হাট কিনে নিয়মিত রাজস্ব দিই। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাধ্যমে সর্বদা হাট পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি। তবে ময়লার ফেলার জায়গার ব্যবস্থা করার দ্বায়িত্ব স্থানীয় জনপ্রতিনিধির (ইউপি চেয়ারম্যান)। নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়েই নদীর পাড়ে ময়লা ফেলতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সবদুল হোসেন খান বলেন, আমি ময়লার স্তুপ সরানোর জন্য উদ্যোগ নিলে স্থানীয় এমপি ওয়াকওয়ে নির্মাণের ঘোষনা দিলে সেটি করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে আমার কাছে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে। বিষয়টি আমি গুরুত্বের সাথে দেখছি। দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পরে বাজার উন্নয়নে একবার ২০ লাখ টাকা পেয়েছি। এ দিয়ে মাছ ও তরকারি চান্নি, সোলার স্ট্রীট লাইটসহ বাজার উন্নয়নে একাধিক কাজ করেছি।

স্থানীয় সাংসদ রনজিত কুমার রায় বলেন, বাজারের বাইরে যশোর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। দ্রুত জনগণের এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

এলাকাবাসী জানায়, ১টি সরকারি কলেজ, ৩টি স্কুল, ১টি স্নাতক মাদরাসা, পুলিশ ক্যাম্প, ৬টি ব্যাংক, ৩টি অটো রাইস মিল, ২৫টি চাতাল, সরকারি খাদ্য গুদাম, পোষ্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ভূমি অফিস, প্রায় ৩৪টি এনজিওসহ ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিশাল এ বাজার। তাই এখানে হাজার হাজার মানুষের পদচারণা। তাই জনগুরুত্বপূর্ণ এ স্থানটির পরিবেশ উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছেন এলাকাবাসী

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত কমেন্টস করুন

https://www.facebook.com

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ সমূহ