পান্থপথের অসতি নারীর আত্মকথন :: জাতির বিবেক অন্ধকূপের গহীনে

মাসুদুর রহমান চাকলা
  • আপডেট সময় : Wednesday, July 30, 2025
  • 834 বার দেখা হয়েছে
ডেস্ক প্রতিবেদন ::
অসতি নারী
মাসুদ চাকলা
শহরের ব্যস্ততম মোড়ে একফালি ভাঙা ফুটপাত। দিনে সেটি মানুষের পদচারণায় ভরা। সকাল শুরু হয় রিকশার ঘণ্টি, ফেরিওয়ালার হাঁক, গাড়ির হর্ন আর পথচারীদের ভিড়ে। শহর নিজের ছন্দে বেঁচে থাকে। কিন্তু রাত নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ফুটপাতটা নীরব হয়ে পড়ে, হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় ধুলো, দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলো কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়। আর এক কোণে সঙ্কুচিত হয়ে থাকে এক অচেনা ছায়া।
সে একসময়ের হয়তো সুন্দরী যুবতী। হয়তো কোনোদিন ভালোবাসা পেয়েছিল, কারো হাত ধরেছিল। হয়তো কোনোদিন তারও একটি ঘর ছিল। সে হাসতো, স্বপ্ন দেখতো, শাড়ির আঁচলে মা ডেকে দৌড়ে যেত গ্রামের সরু পথ ধরে। কিন্তু আজ চুল এলোমেলো, শরীরের কাপড় ছেঁড়া আর ময়লা, চোখদুটো ফাঁকা। লোকে তাকে ডাকে “পাগলি”, কেউ বলে “পাগোল।”
হয়তো পাগোল বা পাগলি বলি। জন্ম থেকে এমনটি নয়। একজন নারী সমাজে কতো অবহেলিত, উপেক্ষিত, তিরস্কৃত। নারীরা বারবার হোচট খায় আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। আবার কিছু উল্টাটাও হয়ে থাকে। তবে তার সংখ্যা ততো নয়। একজন পাগলি বা পাগোল যাই বলি না কেন, সমাজের সব চেয়ে অবহেলিত এক জীব। হয়তো তার জীবনের সবটুকুই কাটে কোন এক ফুটপাতে বা রাস্তার ধারের টং ঘরে।
তার নাম কেউ জানে না। হয়তো তার নাম ছিল রূপা বা সেলিনা। একসময় হয়তো বাবা তাকে কোলে নিয়ে মেলায় গিয়েছিল। হয়তো কারো সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, তারপর কোনো এক পুরুষের প্রতারণায়, গৃহহিংসায় বা দারিদ্র্যের দংশনে, অথবা ধর্ষণের শিকার হয়ে সে ছিটকে পড়েছিল সমাজের গণ্ডি থেকে। দিনকে দিন হারিয়ে যায় তার মানসিক স্থিতি। শেষে একদিন শহর তাকে গিলে খায়।
দিনের বেলায় পথচারীরা তাকে এড়িয়ে যায়। রিকশাওয়ালারা গালি দেয়, কেউবা কৌতুক করে। বাচ্চারা দূর থেকে পাথর ছুঁড়ে হাসে, কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। সন্ধ্যা নামলেই শহরের বাতি জ্বলে ওঠে, আর পাগলির জীবন নেমে যায় অন্ধকারে।
কারণ রাত মানেই ভয়। শহরের আলো ম্লান হলে, নর্দমার পোকা যেমন বের হয়, তেমনি বের হয় মানুষরূপী জানোয়াররা। পুরুষ নামের কিছু কিট, কিছু নরপিশাচ, তার দিকে এগিয়ে আসে। তারা হাসে, ফিসফিস করে।
—“ওই, পাগলি… চুপচাপ থাকবি, নইলে খবর আছে!”
পাগলি আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।
—“কেউ… কেউ নাই? আমারে বাঁচাও!”
কিন্তু শহর ঘুমিয়ে থাকে। অন্ধকারে শুরু হয় নিঃশব্দ পশুত্বের উৎসব। কেউ শোনে না তার চিৎকার। ফুটপাতে ঝরে পড়ে অশ্রু, হাওয়া বয়ে নিয়ে যায় অমানবিকতার গন্ধ।
দিন যায়, মাস গড়ায়। তার শরীর শুকিয়ে যায়, চোখে খিদে আর ভয়ের ছাপ। আর একদিন ভোরে, বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা শহরের ফুটপাতে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। চায়ের দোকানদার চিৎকার করে ওঠে,
—“এই রে! পাগলির বাচ্চা হইছে!”
রাস্তার ধারে, ময়লার ডাস্টবিনের পাশে, ঠাণ্ডা কংক্রিটের উপর ভূমিষ্ঠ হয় এক নবজাতক। শহর থমকে দাঁড়ায় কিছুক্ষণের জন্য। রিকশাওয়ালা কাছে এসে থুতু ফেলে বলে,
—“রে ভাই, বাচ্চা নষ্ট করে দিলেই হইতো, বাঁচলো ক্যান?”
চায়ের দোকানদার মাথা নাড়ে,
—“হ, পাপের ফল এটাই। অসতি নারী!”
পাগলি জবাব দেয় না। তার কোলের শিশুটি ঠাণ্ডায় কাঁপছে, আর সে ফিসফিস করে,
—“তুই… তুই আমাগো মতো হইস না… তুই ভালো হইস…”
কিন্তু চারপাশের মানুষের চোখে কোনো মায়া নেই। সবাই তার দিকে তাকায় যেন সে অপরাধী। শহর জানে না, কারা ছিল সেই রাতের নরপিশাচ। শহর জানে না, কারা তার জীবন শেষ করে দিয়েছে।
দুপুরের দিকে এক এনজিও কর্মী আসে। শিশুটিকে তুলে নেয় হাসপাতালে। পাগলি কাঁদতে কাঁদতে হাত বাড়ায়,
—“ওরে নিবা না… ও আমার…”
কর্মীটি নরম গলায় বলে,
—“ও বাঁচবে না তোমার সঙ্গে, মা… তোমার বাচ্চা বাঁচুক…”
ফুটপাত আবার নীরব হয়ে যায়। রিকশার ঘণ্টি, গাড়ির হর্ন, মানুষজনের ভিড়—শহর আবার নিজের ছন্দে ফিরে যায়। কিন্তু সেই ছন্দের ফাঁকে থেকে যায় এক চাপা হাহাকার।
দিন গড়ায়, বৃষ্টি নামে, রাত পেরোয়। অবশেষে বৃষ্টিভেজা এক ভোরে তাকে আর জীবিত পাওয়া গেল না। বুকে চেপে থাকা ছিল শুধু এক ছেঁড়া শাড়ি। ফুটপাতের এক কোণে, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে, নিঃশব্দে শেষ হয়ে যায় এক অবহেলিত জীবন।
কেউ জানলো না, কোন হাসপাতালের কোণে বড় হলো সেই নবজাতক। কেউ খুঁজলো না তার জন্য কোনো কবর। শহর গিলে খেল তাকে, যেভাবে গিলে খায় হাজার অবহেলিত জীবনকে।
দূরে এক পথশিশু চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল—
—“মা, তুই কোথায় গেলে?”
শহরের বাতাসে ভেসে রইলো শুধু একটাই প্রশ্ন—
এই অপরাধ কার? পাগলির, না সেই সমাজের, যেটি মানুষ হয়ে পশুত্ব ঢেকে রাখে পোশাকের আড়ালে?
নিউজটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত কমেন্টস করুন

https://www.facebook.com

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ সমূহ