আপণ মন্ডল: বরিশালে ঢিল ছুড়ে আম পাড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আ’লীগ নেতার নেতৃত্বে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে সংখ্যালঘু হিন্দু কিশোর ও তার পিতাকে মারধর, মহিলাদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ এবং বাসা ছেড়ে এলাকা ত্যাগের হুমকির ঘটনায় বিসিসি মেয়র ও বরিশাল মহানগর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর কালীবাড়ি রোডের বাসায় শতাধিক লোক জড়ো হয়ে ওই আ’লীগ নেতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানীর অভিযোগে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অনুলিপি দিয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছেও। এ ঘটনায় এলাকাবাসী ও আ’লীগ কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোনো মূহুর্তে ঘটে যেতে পারে প্রাণহানিকর কোন ঘটনা, এমনটাই আশঙ্কা এখন এলাকাবাসীর মধ্যে। ঘটনাটি ঘটেছে ১২ এপ্রিল(মঙ্গলবার) দুপুরে ফজর নামাজের পরপর নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউতলা এলাকায় নিখিল সেন সড়কে।
অভিযোগের সূত্র ধরে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি মো: মনিরুল ইসলাম রুবেলের নিখিল সেন সড়কস্থ বাসভবনে(অবনিল) ১১ এপ্রিল(সোমবার) রাতে ত্রাণসামগ্রী প্যাকেটজাতের কাজে নিয়োজিত ৪-৫ জন কিশোর কাজের ফাঁকে রাত ৯ টার দিকে অবনিলের সামনে ফাঁকা প্লটের একটি আম গাছে ঢিল ছুড়ে আম পাড়ার সময় ওই ঢিল পার্শ্ববর্তী শফিক মিয়ার বাসার টিনের চালায় গিয়ে পড়ে। ঢিলের শব্দ শুনে শফিক মিয়ার ছেলে বাহির এসে ওই কিশোরদের কাছে তাদের ঘরের চালায় ঢিল ছোড়ার কারণ জানতে চায়। এ সময় অবনিল এর গেটম্যান দুলালের ছেলে মুন্নার(১৩) সাথে তার দু’চার কথার বচসা হয়। এক পর্যায়ে স্বপ্নীল নামে এক কিশোর অবনিল এর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে তাদের সরিয়ে দিলে যে যার গন্তব্যে ফিরে যায়। এ বিষয়টি নিয়ে রাতে জট পাকালে মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয়ভাবে মিমাংসার জন্য ওয়ার্ড আ’লীগ সভাপতি রুবেল সময় নির্ধারণ করেন।
এ ঘটনার জের ধরে, সভাপতির মিমাংসার উদ্যোগের কোনো তোয়াক্কা না করেই মঙ্গলবার দুপুরে ফজর নামাজের পরপরই ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারন সম্পাদক মো: মজিবর রহমান বাচ্চুর নেতৃত্বে একই ওয়ার্ড বিএনপি’র সাবেক সভাপতি শাহ আমিনুল ইসলাম আমিন ও আ: খালেক এর ছেলে এহসান মন্টুসহ বিএনপি-জামায়াতের একদল উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মী নিখিল সেন সড়কের দূর্গামন্দিরের কাছে স্থানীয় বাসুদেব দাসের ছেলে স্বপ্নীল(১৪) কে খবর দিয়ে এনে প্রচন্ড মারধর করেন। খবর পেয়ে স্বপ্নীলের বাবা বাসুদেব(৪০) ছেলেকে ছাড়াতে এলে তাকেও সন্ত্রাসীরা উপর্যুপরি লাথি ও কিল-ঘুষি মারতে থাকলে স্থানীয় বিতন দাস(৩০), পান্না(৩০) ফিরাতে এসে তারাও কিল-ঘুষি ও লাথির শিকার হন। এ সময়ে বাচ্চু উত্তেজিত স্বরে বলেন, তোরা হিন্দু হয়ে মুসলমানের গায়ে হাত দিয়েছো, এতো ক্ষমতা কোথায় পেয়েছো? সভাপতি রুবেলের ক্ষমতায় চলো? দাড়া ক্ষমতা দেখাচ্ছি। এ ঘটনার পরপরই বাচ্চু বাসুদেব দাসের বাসার সামনে গিয়ে তার স্ত্রী শিল্পীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দিয়ে বাসা ছেড়ে এলাকা ত্যাগ করার হুমকী দেন। ঘটনাটি মূহুর্তের মধ্যে এলাকায় তোলপাড় ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বাচ্চুর এধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক আচরণ ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের নিয়ে আকস্মিক হামলার কারনে ক্ষুব্ধ খোদ স্থানীয় আ’লীগ নেতাকর্মীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাচ্চু বিএনপি-জামায়াতের ধারায় রাজণীতির কালচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে দলে ভাঙ্গন ধরাতে চাচ্ছেন। তাই আ’লীগ থেকে বাচ্চুর অপসারন দাবী তাদের।
দলমত ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এলাকাবাসীর অনেকেই জানান, আমাদের এলাকায় সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটা ইস্যু তৈরীর মাধ্যমে সম্প্রীতি নষ্ট করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করছে। এ ইস্যু সৃষ্টির পেছনে স্থানীয় দূর্গা মন্দিরের পুকুরটি দখলের পায়তারাও রয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি স্বীকার করেন। তারা বলেন, আ’লীগের সভাপতি এলাকার মুরুব্বী ও গন্যমান্য ব্যক্তি। তিনি বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মিমাংসা করার জন্য সময় নির্ধারন করেছেন এলাকাবাসী তা সশ্রদ্ধে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু তা অগ্রাহ্য করে বাচ্চু আকস্মিক হামলা চালিয়ে আ’লীগ সভাপতিকে চরম অপমান করেছেন। আমরা মাননীয় মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর স্মরনাপন্ন হয়েছি। আমাদের বিশ্বাস, তিনি বিষয়টির সন্তোষজনক সুরাহা করবেন। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী নঈমূল ইসলাম লিটুকেও ঘটনার বিষয় অবহিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এলাকার বর্ষীয়ান রাজণীতিবিদ ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি মো: মনিরুল ইসলাম রুবেল বলেন, সামান্য একটি ঘটনা এলাকার কিশোররা ঘটিয়েছে। স্থানীয়ভাবে মিমাংসার জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম। এলাকাবাসী তাতে সম্মত ছিল। কিন্তু তার আগেই অপ্রত্যাশিতভবে বহিরাগতরা এসে আবার ঝামেলা বাঁধিয়েছে। এ কারণে এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়রের স্মরনাপন্ন হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি বিষয়টির গ্রহনযোগ্য সমাধান দিবেন।
অপরদিকে, ওই কিশোরকে অমানবিক নির্যাতনের ভিডিওচিত্র পার্শবর্তী কাজল ঘোষ গংদের নির্মিয়মান ভবনের সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে তা উদ্ধার করতে পারেনি ভিকটিমপক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত সন্তোষজনক মিমাংসা হবে না কী, স্থানীয় আ’লীগ বিএনপি একজোট হয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এ কিশোর ও তার পরিবারকে সুবিচার থেকে ধামাচাপা দিয়ে বঞ্চিত রাখতে কৌশল অবলম্বন করবে এমন সন্দেহও পোষণ করছেন এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশ।
বিষয়টির ওপর মতামত জানতে ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারন সম্পাদক মো: মজিবর রহমান বাচ্চুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন