অনুসন্ধান ডেস্ক ::
নির্লোভ ও ত্যাগী এক বরেণ্য রাজনীতিকের প্রতিকৃতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মান সবারই আরাধ্য থাকলেও জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করাটাই ছিল তাঁর কাছে প্রধান দায়িত্ব। তাই তো, ২০১৫ সালে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ গ্রহণ করার প্রস্তাব। তাঁর মত ছিল, “রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করি না আমি।”
তিনি ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি ।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ
(১৪ এপ্রিল ১৯২২-২৩ আগস্ট ২০১৯)
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া আর মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন
করেন এবং ইউনেস্কো থেকে একটি ডিপ্লোমা লাভ করেন। মোজাফফর আহমদ এর বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৩৭ সালে। ছাত্রাবস্থায় বৃট্রিশবিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। অধ্যাপনা ছেড়ে পুরোপুরিভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ জেলা কুমিল্লার দেবিদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল প্রাদেশিক পরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে ২৭ জুলাই মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ‘ন্যাপ’ গঠন প্রক্রিয়ায়ও যুক্ত ছিলেন তিনি।
কুখ্যাত সামরিক শাসক আইয়ুব খান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ১৯৫৮ সালে। তাঁকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত দেওয়া হয়। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ও পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। দীর্ঘ আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপেরও তিনি ছিলেন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৯ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি কারাজীবন ভোগ করেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কালীন বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। উপদেষ্টা পরিষদ এর অন্যান্য
সদস্য্যের মধ্যে ছিলেন কমরেড মণি সিংহ, মাওলানা ভাসানী ও মনোরঞ্জন ধর। মোজাফফর আহমদ স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন এর সমন্বয়ে বিশেষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাবাহিনী সংগঠনে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
১৯৭৯ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে তিনি ন্যাপ, সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির পক্ষে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে মোজাফফর আহমদ কারারুদ্ধ হন। রাজনৈতিক কারণে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মানি, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কর্মি সৃষ্টির প্রয়াসে মদনপুরে প্রতিষ্ঠা করেন উপমহাদেশের একমাত্র শিক্ষায়তন “সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ”। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইসমূহ হচ্ছে- ‘সমাজতন্ত্র কি এবং কেন’, ‘প্রকৃত গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা’, ‘মাওবাদী সমাজতন্ত্র ও কিছু কথা’ ইত্যাদি। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেওয়ার ঘোষণা দিলে তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
বয়সের দিকে জীবনের সেঞ্চুরি তিনি পূরণ করতে পারেননি একটুর জন্য। কিন্তু, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাখা ও পালন করা তাঁর ভূমিকা দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে তাঁকে চির-স্মরণীয় করে রাখবে।
আপনার মতামত কমেন্টস করুন