আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ 
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় রবি মৌসুম (অক্টোবর–মার্চ) একটি  গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষা পরবর্তী এই মৌসুমে আবহাওয়া থাকে শুষ্ক, তাপমাত্রা মাঝারি (১৫–২৫°সে) এবং সূর্যালোক পর্যাপ্ত—যা অধিকাংশ উচ্চফলনশীল ফসলের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মৌসুমের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য:
সময়কাল :   অক্টোবর–মার্চ
প্রকৃতি :   শুষ্ক ও ঠান্ডা মৌসুম
বৃষ্টিপাত :  অল্প বা প্রায় অনুপস্থিত
সেচ নির্ভরতা : উচ্চমাত্রায়
উপযোগী অঞ্চল: দেশের প্রায় সব কৃষি অঞ্চল
রবি মৌসুমের প্রধান প্রধান ফসল:
এই মৌসুমে বাংলাদেশের কৃষকরা বহুবিধ ফসল চাষ করে থাকেন, যেমন-বোরো ধান, গম, আলু, সরিষা, মসুর, খেসারি, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন শাকসবজি (বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, লাউ ইত্যাদি)।
এর মধ্যে বোরো ধান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফসল, যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ ভাগ অবদান রাখে।
 কৃষি-প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
 আবহাওয়ার অনুকূলতা ও সেচ ব্যবস্থাপনা:
রবি মৌসুমে বৃষ্টিপাত সীমিত থাকায় সেচ নিয়ন্ত্রিতভাবে দেওয়া যায়, যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
ফসল বৈচিত্র্য ও মাটির উর্বরতা:
ধান–গম–ডাল–তেলবীজ পর্যায়ক্রমিক চাষ (Crop Rotation) মাটির পুষ্টি ভারসাম্য বজায় রাখে।
খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি: 
বোরো ধান জাতীয় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে, আর ডাল ও সবজি জাতীয় ফসল জনগণের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়ক।
অর্থনৈতিক অবদান: 
রবি মৌসুমের ফসলের বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি, ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
কৃষকের করণীয় দিক:
রবি মৌসুমের সফল ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের কিছু করণীয় পদক্ষেপ অনুসরণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
 মাটি পরীক্ষা ও জমি প্রস্তুতি-
আগাম মাটি পরীক্ষা করে পিএইচ মান অনুযায়ী সার প্রয়োগ ও জমি গভীরভাবে চাষ করা।
উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন-
স্থানীয় পরিবেশ ও পানির সহজলভ্যতা বিবেচনা করে বোরো, গম ও তেলবীজের উপযোগী জাত নির্বাচন।
সময়সূচিত বপন ও রোপণ-
 নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ করলে ফসলের বৃদ্ধি ও ফলন উভয়ই বাড়ে।
সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা-
আধুনিক সেচ প্রযুক্তি (Alternate Wetting and Drying) ব্যবহার এবং জৈব ও রাসায়নিক সার সুষমভাবে প্রয়োগ।
রোগ-পোকার দমন-
আইপিএম (Integrated Pest Management) পদ্ধতি অনুসরণ করে রোগ-পোকার আক্রমণ কমানো।
ফসল পর্যায় পরিবর্তন-
একই জমিতে একজাতীয় ফসল বারবার না চাষ করে বৈচিত্র্য বজায় রাখা।
সংরক্ষণ ও বিপণন-
উৎপাদিত ফসল যথাযথভাবে শুকিয়ে ও সংরক্ষণ করে বাজারজাত করা।
রবি মৌসুম বাংলাদেশের কৃষির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি ভারসাম্যের মূলভিত্তি। কৃষকরা যদি সময়োপযোগী প্রযুক্তি, সঠিক জাত নির্বাচন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তবে রবি মৌসুম বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে আরও বৃহৎ সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করবে।
লেখক:  
> সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী
> কৃষি লেখক ও কথক: বাংলাদেশ বেতার
> উপদেষ্টা,দৈনিক গ্রামীণ কৃষি, সংবাদ প্রতিক্ষণ
> সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবি ফেডারেশন

কৃষকের রবি মৌসুম  

অনুসন্ধান ডেস্ক : চাষাবাদ 
ছাঁদে পুঁইশাক চাষের বারো মাস
আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ 
 (কৃষি লেখক ও কথক,বাংলাদেশ বেতার)
✅ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে করনীয়:
★ জমি/পাত্র প্রস্তুত করুন।
★ মাটি, গোবর/কম্পোস্ট, বালু মিশিয়ে নিন।
★ বীজ ভিজিয়ে রেখে অঙ্কুরোদগম করুন।
চাইলে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বীজ বপন শুরু করতে পারেন।
✅ মার্চ-এপ্রিল মাসে করনীয়:
★ এখনই পুঁইশাক চাষের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
★ সরাসরি বীজ বপন বা চারা রোপণ করুন।
★ গাছ বের হলে নিড়ানি দিন ও পানি সরবরাহ করুন।
★ লতা উঠলে মাচা তৈরি শুরু করুন।
✅ মে-জুন মাসে করনীয়:
★ লতা দ্রুত বাড়বে, তাই নিয়মিত ছাঁটাই করুন।
★ গরমে বেশি পানি দিন (কিন্তু পানি জমে থাকতে দেবেন না)।
★ গোবরের তরল সার বা জৈব সার দিন।
✅ জুলাই-আগস্ট মাসে করনীয়
★ বৃষ্টির কারণে পানি জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করুন।
★ পাতায় পোকার আক্রমণ হলে নিমপাতার রস স্প্রে করুন।
★ লতা মাচায় উঠিয়ে দিন।
✅ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে করনীয় 
★ গাছ ঘন হয়ে যাবে, নিয়মিত ডগা কেটে ব্যবহার করুন।
★ তরল সার প্রয়োগ করুন।
★ অক্টোবর মাসেও নতুন করে বীজ বপন করা যায়।
✅ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে করনীয়
★ পুরোনো লতা কেটে ফেলুন।
★ নতুন মাটি তৈরি করুন, কম্পোস্ট যোগ করুন।
★ চাইলে নভেম্বরেও বীজ বপন করা যায়, তবে শীতে গাছ ধীরে বাড়ে।
★ ডিসেম্বর মাসে সাধারণত গাছ বিশ্রাম অবস্থায় থাকে, তাই মাটি ও পাত্র প্রস্তুত করা ভালো।
 সারসংক্ষেপে বলা যায়
★ প্রধান মৌসুম:   মার্চ–অক্টোবর মাস
★ শীতকালীন প্রস্তুতি: নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি মাস।
লেখক: উপদেষ্টা-দৈনিক গ্রামীণ কৃষি, সংবাদ প্রতিক্ষণ ও অগ্নিবার্তা)

চাষাবাদ: ছাঁদে পুৃঁইশাক চাষের বারো মাস  

সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ,Ph.D
(সভাপতি: বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন(BPF)
কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার)
🌱 জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি
★ জমি নির্বাচন ও চাষ করা।
★ গর্ত তৈরি: গর্তের আকার ৫০×৫০×৫০ সেমি।
★ গর্তে পচা গোবর/কম্পোস্ট, টিএসপি ও ছাই মিশিয়ে মাটি ভরাট।
★ উন্নত জাতের বীজ বপন বা চারা প্রস্তুত করা।
🌿 মার্চ–এপ্রিল
★ চারা ৩০–৪০ দিন বয়স হলে গর্তে রোপণ।
★ গাছের গোড়ায় খুঁটি দিয়ে সাপোর্ট দেওয়া।
★ হালকা সেচ দেওয়া।
★ রোগ-পোকার আক্রমণ আছে কিনা খেয়াল রাখা।
🌾 মে–জুন
★ বৃষ্টির কারণে গাছের গোড়ায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
★ অতিরিক্ত ডালপালা কেটে ফেলা।
★ টপড্রেসিং হিসেবে ইউরিয়া ও এমওপি প্রয়োগ।
★ ভাইরাস আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা।
☔ জুলাই–আগস্ট
★ ঝড় ও বৃষ্টির সময় খুঁটি দিয়ে গাছকে শক্ত করা।
★ জমি আগাছামুক্ত রাখা।
★ পাতা কুঁকড়ে যাওয়া বা মোজাইক ভাইরাস হলে আক্রান্ত পাতা তুলে ফেলা।
★ জৈব কীটনাশক/অনুমোদিত রাসায়নিক প্রয়োগ।
🍂 সেপ্টেম্বর–অক্টোবর
★ নতুন ফুল ও ফল আসতে শুরু করবে।
★ নিয়মিত সেচ দেওয়া।
★ সার ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখা।
★ ফল ঝরে পড়া রোধে গাছের গোড়ায় খড়/পাতা দিয়ে আচ্ছাদন দেওয়া।
🍐 নভেম্বর–ডিসেম্বর
★ গাছে ফল বড় হতে থাকবে।
★ রোগ-পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা।
★ প্রথম দিকের ফল সংগ্রহ শুরু করা যায়।
★ নিয়মিত বাজারজাতকরণ করা।
👉 এভাবে সারা বছর নিয়ম মেনে কাজ করলে পেপে গাছ থেকে টানা ১৮–২৪ মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

পেঁপে চাষ : মাসভিত্তিক করণীয়