কৃষি ডেস্ক::
শীতকালে টমেটো 🍅 চাষ বাংলাদেশের কৃষকদের অন্যতম লাভজনক মৌসুমি ফসল। তবে ভালো ফলন পেতে হলে শুরু থেকেই জমি প্রস্তুতি, পরিচর্যা ও রোগ-পোকা দমনে সচেতনতা জরুরি। নিচে ধাপে ধাপে করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো—
⃣ ভূমি নির্বাচন ও জমি প্রস্তুতি:
মাটি:  দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী।
পিএইচ মান:  ৬.০–৬.৮ হলে ফলন সর্বোত্তম হয়।
জমি প্রস্তুতি:  আগাছা পরিষ্কার করে ২–৩ বার চাষ দিন, যাতে মাটি ঝুরঝুরে হয়।
সার প্রয়োগ (প্রতি বিঘা):
পচা গোবর: ২০–২৫ মণ
ইউরিয়া: ৭–৮ কেজি
টিএসপি: ১০–১২ কেজি
এমওপি: ৬–৭ কেজি
 
⃣ চারা রোপণ ও দূরত্ব:
সময়সূচি:  অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রোপণ উপযুক্ত সময়।
দূরত্ব:   সারি ও সারির মধ্যে ২৪–৩০ ইঞ্চি এবং গাছের মধ্যে ১৮–২০ ইঞ্চি ফাঁক রাখুন।
সেচ:  রোপণের পর প্রথম ৫–৭ দিন হালকা সেচ দিন, যাতে চারা সহজে মাটি ধরতে পারে।
⃣ সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা: 
★ সপ্তাহে ২–৩ বার হালকা সেচ দিন।
★ ফুল আসার সময় থেকে প্রতি ২–৩ দিন পর পর নিয়মিত পানি দিন।
★ অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে ফল ও শিকড় পচে যেতে পারে, তাই মাটি অতিরিক্ত ভেজা রাখবেন না।
 
⃣ সার ব্যবস্থাপনা (ফসল চলাকালীন):
★ ফুল ফোটার পর প্রতি ১০–১৫ দিন অন্তর টপ ড্রেসিং হিসেবে ইউরিয়া ১–১.৫ কেজি প্রতি বিঘা পানিতে মিশিয়ে দিন।
★ ক্যালসিয়াম নাইট্রেট প্রয়োগ করলে ফলের ঝরা ও দাগ কমে।
 
⃣ গাছের ট্রেলিস ও ডাল ছাঁটাই:
★ গাছকে খুঁটি বা মাচার সাহায্যে ওপরে উঠতে সহায়তা করুন।
★ নিচের পুরোনো ও আক্রান্ত পাতাগুলো নিয়মিত ছাঁটাই করুন।
★ দুর্বল ডাল কেটে শক্ত ডাল রাখতে হবে, এতে ফলন বৃদ্ধি পায়।
⃣ রোগ-পোকা দমন:
রোগ:  ব্লাইট, পাতা দাগ ও মিলডিউ জাতীয় রোগ দমনে ম্যানকোজেব 75WP বা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রতি ৭–১০ দিন অন্তর স্প্রে করুন।
পোকা:  থ্রিপস, এফিড ও লিফ-ফিডিং পোকা দমনে স্পিনোসাড 45SC বা ইমামেকটিন বেনজোয়েট ব্যবহার করা যেতে পারে।
টিপস:  রোগ দেখা দেওয়ার আগে প্রতিরোধমূলক স্প্রে করুন।
⃣ ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ:
★ ফুল আসার ৬–৭ দিন পর ফল গঠিত হয়।
★ফলের রঙ হালকা লাল হলে সকালে বা বিকেলে সংগ্রহ করুন।
★ বিক্রির আগে ভালো ও আকারে সমান ফল আলাদা করুন।
✅ মনে রাখতে হবে: 
★ হালকা মালচিং (পলিথিন বা খড়) দিলে মাটির উষ্ণতা বজায় থাকে ও ফলন বৃদ্ধি পায়।
★ ফসল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা মাত্র ব্যবস্থা নিন।
★ জমি পরিষ্কার ও নিষ্কাশনব্যবস্থা ঠিক রাখুন।
সতর্ক: পরিচর্যা, সঠিক সেচ ও সময়মতো সার প্রয়োগই শীতকালীন টমেটো চাষে অধিক ফলনের মূল চাবিকাঠি।
লেখক:
আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
★ সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।

শীতকালীন টমেটো চাষ : অধিক ফলনে করনীয়

কৃষি ডেস্ক ::
বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে ধানই প্রধান খাদ্যশস্য। কিন্তু এই ফসলের অন্যতম বড় শত্রু হলো
ইঁদুর। মাঠ পর্যায়ের তথ্যমতে, প্রতিবছর দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৮–১০ শতাংশ ইঁদুরের কারণে নষ্ট
হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষকেরা রাসায়নিক বিষ ব্যবহার
করে ইঁদুর দমন করেন। এতে কিছুটা তাৎক্ষণিক ফল মিললেও দীর্ঘমেয়াদে ফসল, পাখি, গবাদিপশু ও মাটির ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এভাবে কৃষি ও পরিবেশ উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এই বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন এমন একটি পদ্ধতি, যা হবে নিরাপদ, টেকসই ও সাশ্রয়ী। ঠিক এখানেই আসে সজিনার পাতার জৈব সমাধান।
🌿 কেন সজিনার পাতা ?
সজিনা (Moringa oleifera) বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে অতি পরিচিত একটি গাছ। এর পাতা শুধু পুষ্টিকর খাদ্য নয়, এতে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে অ্যালকালয়েড, ট্যানিন, ফ্ল্যাভোনয়েড ও তীব্র গন্ধযুক্ত যৌগ।
এই যৌগগুলো ইঁদুরের জন্য অত্যন্ত বিরক্তিকর ও অসহনীয়; ফলে তারা সেই এলাকা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। অর্থাৎ, এটি সরাসরি হত্যা নয়-বরং প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যা ইঁদুরকে দূরে রাখে অথচ পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।
🌿 জমিতে সজিনা পাতার ব্যবহারবিধি:
১.  প্রতি বিঘা জমির জন্য ২-৩ কেজি তাজা সজিনার পাতা সংগ্রহ করুন।
২.  পাতাগুলো ভালোভাবে পিষে ১০ লিটার পানিতে মিশান।
৩.  ইচ্ছা করলে ২০০ গ্রাম নিমপাতা বা মরিচ বাটা যোগ করে কার্যকারিতা বাড়ানো যায়।
৪. মিশ্রণটি ছেঁকে স্প্রে বোতলে নিন এবং বিকেলবেলা বা সূর্যাস্তের আগে জমির আইল ও ইঁদুরের গর্তের আশেপাশে স্প্রে করুন।
৫. প্রতি ৫-৭ দিন অন্তর প্রয়োগ পুনরাবৃত্তি করুন যতক্ষণ না ইঁদুরের চলাচল বন্ধ হয়।
🌿  প্রাপ্ত ফলাফল:
★ ইঁদুরের চলাচল ধীরে ধীরে কমে যায়।
★ ধানের ক্ষতি ৫০-৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।
★ জমিতে কোনো রাসায়নিক অবশিষ্ট থাকে না।
★ ফসল ও মাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকে।
🌿 মাঠ সচেতন কৃষকের জন্য বার্তা:
বর্তমান বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু উৎপাদন নয়, বরং বিষমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই কৃষকদের এখন সচেতন হতে হবে পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চায়।
সজিনার পাতা দিয়ে ইঁদুর দমন একটি পরীক্ষিত জৈব পদ্ধতি, যা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে এটি হতে পারে “সবুজ কৃষি বিপ্লবের নতুন পথ।”
ইঁদুর দমনে সজিনার পাতা ব্যবহারের প্রচলন যত বাড়বে, ততই কৃষকরা রাসায়নিক নির্ভরতা থেকে মুক্ত হবেন। এতে পরিবেশ রক্ষা পাবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে, আর খাদ্য হবে আরও নিরাপদ।
লেখক:
আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
★ সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।

ধানের জমিতে ইঁদুর দমনে সজিনা পাতা : পরিবেশবান্ধব জৈব সমাধান  

নিজস্ব প্রতিনিধি,ভোলা::
প্রবাদ আছে’ ‘ধান, সুপারি, ইলিশের গোলা’ এই তিনে ভোলা।’দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলায় ধান, ইলিশ ও সুপারির প্রাচুর্য বহু পুরনো ঐতিহ্য। কিন্তু ধান ও ইলিশ উৎপাদনে সরকারের সক্রিয় তদারকি থাকলেও, জেলার অন্যতম অর্থকরী ফসল সুপারির ক্ষেত্রে নেই কোনো সরকারি নজরদারি বা সহায়তা। এতে হতাশ চাষীরা সরকারের সহযোগিতা ও প্রণোদনা কামনা করেছেন।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে ভোলায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৯৬ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা-পাকা সুপারি উৎপাদন হয়েছে। যাঁর বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৭ থেকে ৮ মেট্রিক টন কাঁচা সুপারি ফলন হয়। শুকানোর পর যা ৫ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়।

তবে চাষীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রচেষ্টায় এ ফসল বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে এলেও কৃষি বিভাগের কোনো তদারকি, প্রশিক্ষণ বা গবেষণা কার্যক্রম নেই। ফলে রোগবালাই, উৎপাদন হ্রাস ও বিপণন সমস্যায় ভুগছেন তারা।

ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের চাষি জাকির হাওলাদার বলেন, “আমার দেড় একর জমিতে ১৫০০টি সুপারি গাছ আছে। এ বছর পাতার রোগে শতাধিক গাছ মারা গেছে। কৃষি অফিসে গিয়েও কোনো সহায়তা পাইনি। প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করি, তবুও আমাদের খোঁজ নেয় না কেউ।”

দৌলতখানের চাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমরা অভিজ্ঞতা থেকে চাষ করি। ফলন বাড়ানো বা রোগ দমন নিয়ে কেউ আসে না। সরকারি সহযোগিতা পেলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব।”

চাষীরা জানায়, ভোলায় স্থানীয়ভাবে ‘গা’ ও ‘ভি’ হিসেবে সুপারি বিক্রি হয়। ৩২০ পিস সুপারি= ১ ভি, আর ১০ পিস= ১ গা। এ বছর প্রতি ‘ভি’ সুপারি সাইজ অনুযায়ী ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্য ফসলের তুলনায় সুপারি অনেক লাভজনক
যেখানে ধান বা সবজি থেকে শতাংশপ্রতি আয় হয় ১-১.৫ হাজার টাকা, সেখানে সুপারিতে আয় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। একটি গাছ থেকে ২৫-৩৫ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়।

ভোলা সদর ও দৌলতখানের বাগানগুলোতে এখন চাষীরা ব্যস্ত মৌসুমে সময় পার করছেন। প্রতিটি বাগানে উৎসবের আমেজ। দিন-রাত পরিশ্রম করে শ্রমিকরা গাছে উঠে সুপারি পারছেন। প্রতি গাছ থেকে নামানো এক “ছরা” সুপারির জন্য শ্রমিকরা ৭ টাকা পারিশ্রমিক পান।

কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোলার জলবায়ু ও মাটি সুপারি চাষের জন্য উপযোগী। সরকারি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা পেলে এ খাত থেকে অর্থনীতিতে আরও বিপুল রাজস্ব যোগ হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, “ভোলার সুপারির স্বাদ ও মান দেশের মধ্যে অনন্য। চাষীরা যদি কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, আমরা কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ভোলায় বর্তমানে ৬ কোটি ৪২ লাখেরও বেশি সুপারি গাছ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।

ভোলায় বছরে ২৩০০ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন : নেই কৃষি বিভাগের তদারকি

নগর প্রতিবেদক, ঢাকা ::
 নগর জীবনে ছাদ কৃষি সম্প্রসারণ ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন(BPF)  সম্প্রতি রাজধানীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে উন্নত জাতের সবজি বীজ বিতরণ করেছে।
অনুষ্ঠানে অর্থকাল পত্রিকার সম্পাদক –  প্রকাশক  ও বিজিআইসি’র পিআরও  কবি সালাম মাহমুদ এবং পুষ্পধারা প্রপার্টিজ লিমিটেডের পরিচালক জনাব খোরশেদ আহমেদ-এর হাতে উন্নত জাতের সবজি বীজ তুলে দেন  বিপিএফ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি বিশিষ্ট  কৃষি লেখক আলহাজ্ব ড. সরকার মোঃ আবুল কালাম আজাদ।
এসময়ে সভাপতির সাথে  উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি করিম খান এবং সিনিয়র সাংবাদিক  বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিন্নাতুল ইসলাম জিন্নাহ।
ড. আজাদ বলেন, “ছাদ কৃষি শুধু শখ নয়, এটি নগরবাসীর জন্য একটি টেকসই জীবনযাত্রার অংশ। প্রতিটি ছাদকে সবুজ ছাউনিতে পরিণত করা গেলে শহর হবে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর।”

ছাদ কৃষি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে  পেশাজীবী ফেডারেশন : বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে উন্নত জাতের সবজি বীজ বিতরণ

 কৃষি ডেস্ক::
বাংলাদেশের কৃষি প্রধান এই দেশে শীতকালকে বলা হয় সবজি চাষের সোনালী মৌসুম। প্রাকৃতিকভাবে এই সময়ের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গরমের সময়ের তুলনায় শীতকালে মাটির উর্বরতা বেশি থাকে, রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং সবজির গুণমানও উন্নত থাকে। তাই কৃষকেরা এই মৌসুমে নানা ধরনের সবজি চাষ করে থাকেন যা একদিকে যেমন পুষ্টির যোগান দেয়, অন্যদিকে কৃষকের আয়ও বহুগুণে বাড়ায়।
শীতকালীন শাক-সবজির বৈচিত্র্য
ফুলকপি ও ব্রোকলি:
এই দুটি সবজি ভিটামিন ‘সি’,আয়রন ও ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস। ফুলকপি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে জনপ্রিয় এবং ব্রোকলি আধুনিক উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। ব্রোকলির বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি, তাই এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প হতে পারে।
বাঁধাকপি ও ক্যাপসিকাম:
বাঁধাকপি সালাদ ও রান্নার উপযোগী সবজি, আর ক্যাপসিকাম বা বেলপেপার রপ্তানিযোগ্য সবজি হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অল্প জমিতে এই দুটি ফসলের উচ্চ ফলন সম্ভব।
মরিচ, চেরি টমেটো ও বেগুন:
এগুলো ঘরোয়া রান্নার অপরিহার্য উপাদান। মরিচের ঝাঁজ, টমেটোর রঙ আর বেগুনের স্বাদ-সবই আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। বিশেষ করে চেরি টমেটো এখন বাণিজ্যিকভাবে ছাদবাগান ও পলিথিন টানেল চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।
বিটরুট:
রক্তবর্ধক হিসেবে বিটরুটের কোনো বিকল্প নেই। এতে রয়েছে আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরকে সতেজ রাখে। বাংলাদেশে এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
শিম ও বরবটি:
শীতকালীন প্রোটিনসমৃদ্ধ সবজি হিসেবে শিম ও বরবটির জুড়ি নেই। বিভিন্ন জাতের শিম (লাবলাব, সাদা, মটরশিম ইত্যাদি) এখন উন্নত বীজের মাধ্যমে সারাদেশে সফলভাবে চাষ হচ্ছে।
স্কোয়াশ:
এটি একটি আধুনিক বিদেশি ফসল, এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় হচ্ছে। অল্প সময়ে ফলন দেয় এবং বাজারে দামও ভালো থাকে।
বাটাশাক, লাউ, ধনিয়া পাতা, লেটুস ও লাল শাক:
এই শাকজাত ফসলগুলো স্বল্প সময়ে ঘরোয়া বা বাণিজ্যিক চাষের জন্য আদর্শ। লেটুস ও ধনিয়া পাতা সালাদ ও গার্নিশিংয়ে ব্যবহৃত হয়, আর লাল শাকে রয়েছে লৌহ ও ক্যালসিয়ামের আধিক্য।
শীতকালীন সবজি চাষের সুবিধা
✅ স্বল্প সময়ে বেশি ফলন:   বেশিরভাগ সবজি ৬০–৯০ দিনের মধ্যে তোলা যায়।
✅ রোগ-পোকা কম:   শীতল আবহাওয়ায় রোগের প্রকোপ কম থাকে, ফলে কীটনাশক ব্যবহারও কম লাগে।
✅ ভালো বাজারমূল্য:   শীতের সবজির চাহিদা শহর ও গ্রামে সবখানেই বেশি।
✅ পুষ্টি নিরাপত্তা:  সবজি আমাদের শরীরে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ সরবরাহ করে, যা সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য।
✅ ছোট পরিসরে চাষযোগ্য:  বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা টবেও সহজে উৎপাদন সম্ভব।
সঠিক বীজ ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা
সবজি চাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উন্নত মানের বীজ নির্বাচন। স্থানীয় জলবায়ুর সাথে উপযোগী জাত, সময়মতো বপন ও সুষম সার ব্যবহারে ফলন অনেক বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি, জৈব সার, মালচিং ও ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারে খরচ কমে ও মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয়।
শীতকালীন শাক-সবজি চাষ শুধু কৃষকের আয়ের উৎস নয়-এটি পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রতীক। আধুনিক বীজ, সঠিক পরিকল্পনা ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশে শীতকালীন সবজি উৎপাদন আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। প্রত্যেক কৃষক যদি সামান্য জমিতেও এই মৌসুমি ফসল চাষে আগ্রহী হন, তবে একদিকে বাড়বে পরিবারের পুষ্টি, অন্যদিকে শক্ত হবে দেশের অর্থনীতি।
লেখক:
আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
★ সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।

শীতকালীন শাক-সবজির বীজ : পুষ্টি, সম্ভাবনা ও কৃষির নতুন দিগন্ত  

 কৃষি ডেস্ক::
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনটিকেই এই দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়-খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, এটি কোনো বিলাসিতা নয়।
২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য-“খাদ্য নিরাপত্তায় স্মার্ট কৃষি, টেকসই পৃথিবীর অঙ্গীকার”-বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও খাদ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে একেবারে সময়োপযোগী।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই প্রতিপাদ্যের গুরুত্ব আরও গভীর। কারণ, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রায় ১৩ শতাংশ জিডিপি কৃষি খাত থেকে আসে, এবং কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। কৃষিই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ আশ্চর্যজনক সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে দেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টন, এখন তা বেড়ে ৪ কোটি টনেরও বেশি। আমরা আজ ধান, সবজি, মাছ ও পোলট্রি উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে। এটি সম্ভব হয়েছে কৃষকের পরিশ্রম, কৃষি গবেষণার অগ্রগতি এবং সরকারের সময়োপযোগী নীতিমালার কারণে।
তবে এখন চ্যালেঞ্জের ধরন বদলেছে। খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় লক্ষ্য।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে, এবং খাদ্য অপচয় বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন-এই বাস্তবতাগুলো আমাদের ভাবায়।
তাই টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার জন্য এখন প্রয়োজন-
★ বিষমুক্ত কৃষি ও জৈব উৎপাদন
★ পানি ও মাটির সুষম ব্যবহার
★ ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং
★ খাদ্য অপচয় হ্রাসে- সামাজিক সচেতনতা।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি, ড্রোন ও সেন্সর-ভিত্তিক চাষাবাদ, ছাদ কৃষি, এবং শহুরে কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের “এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকবে না” উদ্যোগ, খাদ্য মজুত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, এবং পুষ্টি বৈচিত্র্য কর্মসূচি—এসবই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
তবে শুধু সরকার নয়, আমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব নিতে হবে—
নিজের ঘরে, ছাদে বা ছোট জায়গায় হলেও কিছু চাষ করা; খাদ্য অপচয় রোধ করা; এবং নিরাপদ, স্থানীয় খাদ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
খাদ্য নিরাপত্তা মানে শুধু পেট ভরা নয়-এটি সুস্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও জাতির উন্নয়নের শিকড়।
স্মার্ট কৃষি, পুষ্টিকর খাদ্য ও সঠিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিন “ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ”-এর লক্ষ্য অর্জন করবে—এই প্রত্যাশায় বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকার হোক সবার।
লেখক:
আলহাজ্ব ড্ সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক, বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি
★ সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫ 

অনুসন্ধান কৃষি ডেস্ক ::
দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যার চাপ এবং কংক্রিটের আধিপত্যে রাজধানী ঢাকার সবুজ প্রকৃতি আজ প্রায়
বিলীন হওয়ার পথে। খোলা জায়গার অভাব, বায়ুদূষণ,
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এখন শহরবাসীর বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে ছাদ কৃষি আর কেবল শখ নয় এটি হয়ে উঠছে নগর জীবনের টেকসই সমাধান, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষার এক কার্যকর উদ্যোগ।
নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যের উৎস:
শহরে বাজারের সবজি ও ফল প্রায়ই কীটনাশক ও রাসায়নিক মিশ্রণে দূষিত। ছাদ কৃষির মাধ্যমে পরিবার নিজের ছাদেই জৈব উপায়ে চাষ করে পেতে পারে বিশুদ্ধ, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে এবং পরিবারে খাদ্যনির্ভরতা বৃদ্ধি পায়।
নগর পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: 
সবুজ ছাদ ভবনের তাপমাত্রা কমিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখে, ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। গাছ বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন উৎপন্ন করে এবং ধুলা ও দূষণ কমায়। এটি শহরের তাপদ্বীপ (Urban Heat Island) প্রভাবও হ্রাস করে।
 মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক বন্ধন:
ছাদে গাছের পরিচর্যা মানসিক প্রশান্তি আনে, কাজের চাপ কমায় ও মনকে প্রফুল্ল রাখে। পরিবার একসাথে গাছ লাগানো বা ফল সংগ্রহে যুক্ত হলে পারিবারিক সম্পর্কও আরও দৃঢ় হয়। শিশুরা প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা শেখে।
অর্থনৈতিক সাশ্রয় ও উদ্যোক্তা সম্ভাবনা:
ছাদ কৃষি একদিকে খাদ্য ব্যয় কমায়, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসল বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয়ও সম্ভব। অনেকেই এখন ছাদ কৃষিকে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণ করছেন—হাইড্রোপনিক, ভার্টিক্যাল ফার্মিং বা পাত্রভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
টেকসই নগর উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন:
ছাদ কৃষি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে সহায়তা করে, নগরের সবুজ এলাকা বাড়ায় এবং ভবনগুলোকে পরিবেশবান্ধব করে তোলে। এটি নগর পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন (SDG 11: Sustainable Cities and Communities) বাস্তবায়নেরও অন্যতম উপায়।
 পরিশেষে বলা যায় –
রাজধানীতে ছাদ কৃষি হলো এক সবুজ বিপ্লব, যেখানে
✅ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন,
✅ পরিবেশ সুরক্ষা,
✅ মানসিক প্রশান্তি, এবং
✅ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—
সব একসাথে মিশে যায়।
নগর জীবনে “সবুজের ছাদ” শুধু একটি ধারণা নয়, বরং এটি আগামী প্রজন্মের জন্য টেকসই ও বাসযোগ্য রাজধানী গড়ার এক বাস্তব পদক্ষেপ।
লেখক: 
★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও  কথক, বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষি

🌿   রাজধানীতে ছাদ কৃষির গুরুত্ব   🌿

অনুসন্ধান কৃষি ডেস্ক::   
একই জমিতে একসাথে দুই বা ততোধিক ফসল চাষ করাকেই সাথী ফসল বলে।  মানে,  এক ফসলের সাথে আরেক ফসল-দুইজন যেন একসাথে জমিতে “সাথী” হয়ে বড় হয়। এতে জমি, সময় আর শ্রম সব কিছুর ভালো ব্যবহার হয়।
কেন সাথী ফসল চাষ করা দরকার:
জমি ফাঁকা পড়ে থাকে না। একসাথে দুই ফসল পেলে লাভও বেশি, মাটির উর্বরতাও বাড়ে, রোগ-পোকা কম লাগে, এক ফসল নষ্ট হলেও আরেকটা থেকে আয় হয়।
প্রচলিত কিছু ভালো সাথী ফসলের জোড়া:
ভুট্টা+মুগডাল: ভুট্টা দাঁড়িয়ে থাকে, মুগডাল নিচে বিছিয়ে জমি ঢেকে রাখে।
আখ+তিল/শাকসবজি: আখের ফাঁকে তিল বা শাক চাষে বাড়তি আয়
ধান+আলু/পিঁয়াজ/রসুন:  এক জমিতে দুই ফসলের ফলন
পাট+মুগডাল:  মুগডাল মাটিতে নাইট্রোজেন যোগায়, পাট ভালো হয়
আমবাগান+সবজি/ডাল ফসল:  বাগানের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগে
চাষের সময় আমাদের যা মনে রাখা প্রয়োজন:
★ সাথী ফসল যেন একে অপরের ক্ষতি না করে
ফসলের পানি, আলো, পুষ্টি চাহিদা আলাদা হলে ভালো হয়
★ জমি ও মৌসুম অনুযায়ী আমাদের ফসল বাছাই করতে হবে
★ এক ফসল তোলা হলে অন্যটা যেন বেড়ে উঠতে পারে
সাথী ফসল চাষাবাদে কৃষকের লাভ:
★ একই জমিতে দুই ফসল, তাই দ্বিগুণ আয়।
★ সার ও শ্রমিক খরচ বাঁচে
★ জমির উর্বরতা বাড়ে।
★ এক ফসল নষ্ট হলেও পুরো ক্ষতি হয় না।
সাথী ফসল চাষ হলো বুদ্ধিদীপ্ত কৃষি ব্যবস্থা। এতে জমি অপচয় হয় না, খরচ কমে, আয় বাড়ে। সঠিক পরিকল্পনায় করলে সারা বছর জমি ব্যস্ত রাখা যায়, কৃষকও থাকে নিশ্চিন্ত ও লাভবান।
লেখক:
কৃষি লেখক ও কথক,বাংলাদেশ বেতার
উপদেষ্টা, দৈনিক গ্রামীণ কৃষিও সংবাদ প্রতিক্ষণ
সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
সাধারণ সম্পাদক: আমরা পল্লবী বাসী,ঢাকা।

কৃষকের সাথী ফসল : লাভজনক প্রযুক্তি 

কেরালা সীম চাষ :

(অক্টোবর-ফেব্রুয়ারি)

শীতকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী সবজি ফসল

কেরালা সীম। এই সীমের শুঁটি কোমল, সুস্বাদু ও বাজারে চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় কৃষকের আয় বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।

কেরালা সীমের বৈশিষ্ট্যসমূহ:

কেরালা সীম বরবটি প্রজাতির জনপ্রিয় এক জাতের সীম। এটি বিশেষ করে আগাম শীতকালীন ও শীত মৌসুমে চাষের উপযোগী। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে -ভারতের কেরালা রাজ্যে উদ্ভাবিত ও বাংলাদেশে পরীক্ষিত একটি উচ্চ ফলনশীল জাত।

স্থানীয়ভাবে “কেরালা সীম” বা “কেরালা বরবটি” নামে পরিচিত।

গাছ লতানো প্রকৃতির, শক্ত ও দীর্ঘ লতা তৈরি করে।

মাচা দিলে ফলন বেশি হয়।

ফুল হালকা বেগুনি বা সাদা রঙের।

ফল লম্বা, সবুজ ও নরম হয়।

প্রতি গাছে প্রচুর ফুল ও ফল ধরে

বপনের ৫০–৬০ দিনের মধ্যে ফলন শুরু হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে ফলন দিতে থাকে (প্রায় ২–৩ মাস পর্যন্ত

হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৫–১৮ টন ফলন পাওয়া যায়।

যথাযথ পরিচর্যা ও সার ব্যবস্থাপনায় ফলন ২০ টন পর্যন্ত হতে পারে।

সবুজ, লম্বা ও আকর্ষণীয় ফলে বাজারে চাহিদা বেশি।

রান্নার পর নরম ও সুস্বাদু হয়, আঁশ কম।

মোজাইক ভাইরাস, ছত্রাক ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম হয়।

দ্রুত ফলনশীল ও দীর্ঘ সময় ফল দেয় বলে কৃষক ভালো লাভবান হয়।

এক মৌসুমে ৩-৪ বার ফসল সংগ্রহ করা যায়, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য লাভজনক।

অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত চাষের জন্য উপযুক্ত সময়।

তাছাড়া, এটি মাটিতে জৈব নাইট্রোজেন বৃদ্ধি করে, ফলে পরবর্তী ফসলের উৎপাদনেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।

কেরালা সীম চাষ এখন শুধু মৌসুমি নয়-স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে এটি হয়েছে উচ্চ লাভজনক টেকসই ফসল।

🌿 অক্টোবর মাস:

জমি প্রস্তুতি ও বীজ বপন পর্ব:

কৃষকের করণীয়ঃ

আগের ফসল সরিয়ে জমি ভালোভাবে চাষ করুন ও মই দিন।

প্রতি শতাংশে ৪০-৫০ কেজি পচা গোবর প্রয়োগ করুন।

উন্নত জাত নির্বাচন করুন (বারি সীম-২, বারি সীম-৩, কেরালা সীম)।

প্রতি শতাংশে ২৫০-৩০০ গ্রাম বীজ সারিতে বপন করুন (সারি ৬০ সেমি, গাছ ৩০ সেমি দূরে)।

বপনের পর হালকা সেচ দিন।

প্রযুক্তি প্রয়োগঃ

ট্রাক্টরে জমি তৈরি করুন।

মাটির pH ৬.০–৭.৫ নিশ্চিত করতে পরীক্ষা করুন।

🌿 নভেম্বর মাস:
চারা পরিচর্যা ও মাচা স্থাপন পর্ব:

কৃষকের করণীয়ঃ

৭-১০ দিনের মধ্যে চারা গজানোর পর আগাছা পরিষ্কার করুন।

প্রথম কিস্তির ইউরিয়া (০.৪ কেজি/%) প্রয়োগ করুন।

গাছ ২০-২৫ সেমি হলে বাঁশ বা জালের মাচা তৈরি করুন।

পানি জমে না থাকার ব্যবস্থা করুন।

প্রযুক্তি প্রয়োগঃ

মাটির আর্দ্রতা সেন্সর ব্যবহার করে সেচ নিয়ন্ত্রণ।

নিম তেল (৫ মি.লি./লিটার পানি) স্প্রে করে পোকা প্রতিরোধ।

ড্রিপ ইরিগেশন ব্যবস্থায় ৫০% পানি সাশ্রয়।

🌿 ডিসেম্বর মাস:
গাছের বৃদ্ধি ও ফুল ফোটা পর্ব :

কৃষকের করণীয়ঃ

লতা মাচায় সমানভাবে ছড়িয়ে দিন।

আগাছা পরিষ্কার করুন ও টিএসপি, এমওপি সারের অবশিষ্ট অংশ প্রয়োগ করুন।

ফুল আসার সময় দ্বিতীয় কিস্তির ইউরিয়া (০.৪ কেজি/%) দিন।

নিয়মিত হালকা সেচ দিন।

প্রযুক্তি প্রয়োগঃ

ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে ফল ছিদ্রকারী পোকার দমন।

IoT সেন্সরে মাটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মনিটর।

জৈব সার (লিকুইড কম্পোস্ট বা বায়োফার্টিলাইজার) প্রয়োগ।

🌿  জানুয়ারি মাস:
 ফল ধরা ও সংগ্রহ পর্ব :
কৃষকের করণীয়ঃ
প্রথম ফল দেখা দিলে নিয়মিত সেচ দিন।
প্রতি ২–৩ দিন অন্তর শুঁটি সংগ্রহ করুন।
গাছের গোড়ায় তরল জৈব সার দিন।
ফল তোলার সময় লতা যেন না ভাঙে তা খেয়াল রাখুন।
প্রযুক্তি প্রয়োগঃ
নিমপাতা নির্যাসভিত্তিক জৈব কীটনাশক ব্যবহার।
সোলার ফগার মেশিনে স্প্রে করে সময় ও শ্রম সাশ্রয়।
 🌿 ফেব্রুয়ারি মাস:
  শেষ পর্যায়ের সংগ্রহ ও ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা
কৃষকের করণীয়ঃ
শেষ পর্যায়ের শুঁটি সংগ্রহ করুন।
পুরনো ডাল ছেঁটে গাছকে নতুন শাখা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিন।
গাছ শুকিয়ে গেলে জমি পরিষ্কার করুন।
বাজারজাতের জন্য সীম বাছাই, গ্রেডিং ও প্যাকিং করুন।
পরবর্তী ফসলের জন্য চুন ও জৈব সার প্রয়োগ করুন।

বরবটি প্রজাতি জানুয়ারি মাস:
ফল ধরা ও সংগ্রহ পর্ব :

কৃষকের করণীয়ঃ

প্রথম ফল দেখা দিলে নিয়মিত সেচ দিন।

প্রতি ২–৩ দিন অন্তর শুঁটি সংগ্রহ করুন।

গাছের গোড়ায় তরল জৈব সার দিন।

ফল তোলার সময় লতা যেন না ভাঙে তা খেয়াল রাখুন।

🌿 প্রযুক্তি প্রয়োগঃ

সোলার ড্রায়ারে সীম শুকিয়ে সংরক্ষণ।

উৎপাদন তথ্য Digital Farm Record অ্যাপে সংরক্ষণ।

পরবর্তী ফসলের পরিকল্পনায় মাটি বিশ্লেষণ রিপোর্ট ব্যবহার।

কেরালা সীম চাষে স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যম

✅ প্রতি শতাংশে ৪০–৫০ কেজি ফলন
✅ পানি ও সার সাশ্রয় ৪০–৫০%
✅ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা
✅ কৃষকের গড় আয় বৃদ্ধি ২–৩ গুণ পর্যন্ত

লেখক: আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ

★ সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবী ফেডারেশন
★ কৃষি লেখক ও কথক : বাংলাদেশ বেতার
★ উপদেষ্টা: দৈনিক গ্রামীণ কৃষি

চাষাবাদ: কেরালা সীম

আলহাজ্ব ড. সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ 
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় রবি মৌসুম (অক্টোবর–মার্চ) একটি  গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্ষা পরবর্তী এই মৌসুমে আবহাওয়া থাকে শুষ্ক, তাপমাত্রা মাঝারি (১৫–২৫°সে) এবং সূর্যালোক পর্যাপ্ত—যা অধিকাংশ উচ্চফলনশীল ফসলের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মৌসুমের সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য:
সময়কাল :   অক্টোবর–মার্চ
প্রকৃতি :   শুষ্ক ও ঠান্ডা মৌসুম
বৃষ্টিপাত :  অল্প বা প্রায় অনুপস্থিত
সেচ নির্ভরতা : উচ্চমাত্রায়
উপযোগী অঞ্চল: দেশের প্রায় সব কৃষি অঞ্চল
রবি মৌসুমের প্রধান প্রধান ফসল:
এই মৌসুমে বাংলাদেশের কৃষকরা বহুবিধ ফসল চাষ করে থাকেন, যেমন-বোরো ধান, গম, আলু, সরিষা, মসুর, খেসারি, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন শাকসবজি (বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, লাউ ইত্যাদি)।
এর মধ্যে বোরো ধান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফসল, যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ ভাগ অবদান রাখে।
 কৃষি-প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
 আবহাওয়ার অনুকূলতা ও সেচ ব্যবস্থাপনা:
রবি মৌসুমে বৃষ্টিপাত সীমিত থাকায় সেচ নিয়ন্ত্রিতভাবে দেওয়া যায়, যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
ফসল বৈচিত্র্য ও মাটির উর্বরতা:
ধান–গম–ডাল–তেলবীজ পর্যায়ক্রমিক চাষ (Crop Rotation) মাটির পুষ্টি ভারসাম্য বজায় রাখে।
খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি: 
বোরো ধান জাতীয় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে, আর ডাল ও সবজি জাতীয় ফসল জনগণের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়ক।
অর্থনৈতিক অবদান: 
রবি মৌসুমের ফসলের বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি, ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
কৃষকের করণীয় দিক:
রবি মৌসুমের সফল ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের কিছু করণীয় পদক্ষেপ অনুসরণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
 মাটি পরীক্ষা ও জমি প্রস্তুতি-
আগাম মাটি পরীক্ষা করে পিএইচ মান অনুযায়ী সার প্রয়োগ ও জমি গভীরভাবে চাষ করা।
উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন-
স্থানীয় পরিবেশ ও পানির সহজলভ্যতা বিবেচনা করে বোরো, গম ও তেলবীজের উপযোগী জাত নির্বাচন।
সময়সূচিত বপন ও রোপণ-
 নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ করলে ফসলের বৃদ্ধি ও ফলন উভয়ই বাড়ে।
সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা-
আধুনিক সেচ প্রযুক্তি (Alternate Wetting and Drying) ব্যবহার এবং জৈব ও রাসায়নিক সার সুষমভাবে প্রয়োগ।
রোগ-পোকার দমন-
আইপিএম (Integrated Pest Management) পদ্ধতি অনুসরণ করে রোগ-পোকার আক্রমণ কমানো।
ফসল পর্যায় পরিবর্তন-
একই জমিতে একজাতীয় ফসল বারবার না চাষ করে বৈচিত্র্য বজায় রাখা।
সংরক্ষণ ও বিপণন-
উৎপাদিত ফসল যথাযথভাবে শুকিয়ে ও সংরক্ষণ করে বাজারজাত করা।
রবি মৌসুম বাংলাদেশের কৃষির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি ভারসাম্যের মূলভিত্তি। কৃষকরা যদি সময়োপযোগী প্রযুক্তি, সঠিক জাত নির্বাচন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তবে রবি মৌসুম বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে আরও বৃহৎ সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করবে।
লেখক:  
> সাধারণ সম্পাদক, আমরা পল্লবী বাসী
> কৃষি লেখক ও কথক: বাংলাদেশ বেতার
> উপদেষ্টা,দৈনিক গ্রামীণ কৃষি, সংবাদ প্রতিক্ষণ
> সভাপতি, বাংলাদেশ পেশাজীবি ফেডারেশন

কৃষকের রবি মৌসুম